ব্রেকিং নিউজ

বহু সত্য বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা, কুটির শিল্পাদিতে সুদক্ষ হওয়া, বিনয়ে সুশিক্ষিত হওয়া এবং মিথ্যাদি বর্জিত সুভাষিত বাক্য ভাষণ করা উত্তম মঙ্গল –কেন?

বহু সত্য বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা, কুটির শিল্পাদিতে সুদক্ষ হওয়া, বিনয়ে সুশিক্ষিত হওয়া এবং মিথ্যাদি বর্জিত সুভাষিত বাক্য ভাষণ করা উত্তম মঙ্গল –কেন?

ইলা মুৎসুদ্দী

10

বহু সচ্চঞ্চ সিপ্পঞ্চ বিনযো চ সুসিক্খিতো

সুভাসিতা চ যা বাচা এতং মঙ্গল মুত্তমং।

বহু সত্য বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা, কুটির শিল্পাদিতে সুদক্ষ হওয়া, বিনয়ে সুশিক্ষিত হওয়া এবং মিথ্যাদি বর্জিত সুভাষিত বাক্য ভাষণ করা উত্তম মঙ্গল।

এই সংসারে শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতগণই একমাত্র বহুশ্রুততা অর্জনে সমর্থ হন। শাস্ত্রজ্ঞ না হলে বহুশ্রুততা আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। বহুশ্র“তের লক্ষণ হিসাবে বুদ্ধ শাসনে দেখা যায়-কোন কোন ভিক্ষু সূত্র-বিনয় শিক্ষা করে অনুক্রমে শীল সমাধি পূর্ণ করেন। ক্রমে সেই পূর্ণতার মাধ্যমেই পরমার্থ সত্য নির্বাণ ফল প্রত্যক্ষ করেন। সুতরাং সেই শ্র“তবান আর্যশ্রাবক অকুশল ত্যাগ করে কুশল বর্ধন করেন, স্বদোষ (উৎপন্ন পাপ) পরিত্যাগ করে নির্দোষ চারি স্মৃত্যুপস্থানাদি সপ্ত বোধ্যঙ্গ ভাবনা করেন এবং আপন চিত্তকে শুদ্ধভাবে রক্ষা করেন।

এই বহুশ্র“ত দ্বিবিধ। পরিয়ত্তি-বহুশ্র“ত, প্রতিবেধ-বহুশ্র“ত। যেই ভিক্ষু ত্রিপিটকে পারদর্শী, তিনি পরিয়ত্তি-বহুশ্র“ত আর চারি আর্যসত্যে যাঁর জ্ঞান উৎপন্ন হয়েছে, তিনি প্রতিবেধ-বহুশ্রত। এই দ্বিবিধ বহুশ্র“তের মধ্যে ধর্ম পরিবেশনার জন্য পরিয়ত্তি বহুশ্র“ত ভিক্ষুরই সমধিক প্রয়োজন। বহুশ্র“ত ভিক্ষুগণ চারি আর্যসত্যকে অভিজ্ঞাতব্য, প্রহীতব্য, প্রত্যক্ষিতব্য ও ভাবিতব্য হিসাবে বিভাগ করে দেখাতে সমর্থ হন। তাঁদের দেশনাই চরম ও পরম দেশনা বলে অভিহিত হয়। এই উত্তম বির্বতগামী ধর্ম দানের দ্বারা সমস্ত ভব দুঃখ অতিক্রমের উপায় লাভ করা যায়। জগতে ধর্মদানই শ্রেষ্ঠ দান। এই ধর্মদান সকল দানকে পরাভূত করে এবং দেব-সম্পদাদি লাভের মূলীভূত কারণ সৃষ্টি করে।

শিল্প বলতে-সেলাই কর্ম, বয়ন কর্ম, তাঁতশিল্প, বেতশিল্প, কুটির শিল্প প্রভৃতি কর্মে দক্ষতা অর্জন করা। শিল্পকর্মে পারদর্শিতা অর্জনের মাধ্যমে পরিবারে, সমাজে তথা রাষ্ট্রের মহামঙ্গল সাধন করা যায়। এ বিষয়ে লোকনীতিতে আঠার প্রকার শিল্পের উল্লেখ আছে যথা-‘শ্র“তি সম্মুতি সংখ্যা যোগ নীতি বৈশেষিক গন্ধর্ব গণিকা ধনুর্বেদ পুরাণ চিকিৎসা ইতিহাস জ্যোতিষ মায়া ছন্দ কেতু মন্ত্র ও শব্দ এই আঠারটিকে শিল্প-শাস্ত্র বলে। এই জগতে শিল্প বা বিদ্যার সমান ধন নাই। অর্জিত শিল্প জ্ঞান চোর ডাকাত বা অন্য কেহ প্রাণ নাশক শত্র“ হরণ করে নিতে পারে না। শিল্পবিদ্যা মানবের পরম কল্যাণমিত্র স্বরূপ। অর্জিত শিল্পগুণে মানুষ সুখে জীবনযাত্রা নির্বাহ করে। পরলোকেও পরম সুখের অধিকারী হওয়া যায়। গার্হস্থ্য জীবনে পঞ্চ অধর্ম বাণিজ্য ত্যাগ করে পবিত্রভাবে সজ্জীবিকা দ্বারা জীবন নির্বাহ করা সর্বতো মঙ্গল।

ধর্ম-বিনয়ে সুশিক্ষিত হওয়া মানে চারি পরিশুদ্ধি শীলে সুপ্রতিষ্ঠিত থেকে হরহত্ত্ব মার্গফলে উন্নীত হয়ে জাগতিক সর্ব দুঃখের অবসান করা। শুধু ভিক্ষু যে বিনয়শীল শিক্ষা করে সুশিক্ষিত হবে একথা নহে, গৃহীদেরও বিনয়শীল শিক্ষা করা একান্ত কর্তব্য। ‘সিগালোবাদ সূত্র’ গৃহীদের বিনয় নীতির আকর। যারা বিনয় জানে না, তারা কিভাবে ভদ্র বিনীত শান্ত দান্ত হবে? বিনয়-শীলে শিক্ষিত নয় বলে বর্তমান অনেকে ভদ্রতা প্রদর্শনে পশ্চাদ্পদ। তাই বলা হয়েছে- ‘বিনযং সো ন জানতি সাধু তস্স অদস্সনং’ যারা বিনয় ব্যবহার জানে না, তারা সাধুতা ভাব দেখাতে জানে না। অভদ্র অবিনীত মানুষ সকলের ঘৃণার পাত্র হয়। পাপ-অকুশল বিসর্জন বা বিনম্র আচরণ শিক্ষা করার নামই ‘বিনয়’। বিনয়-শীলে শিক্ষিত মানুষ দেব-মানব সকলের পূজা ভাজন হয়। সর্বত্র তাঁদের সুযশ-সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তাঁদের ভদ্রতা দর্শনে ও প্রিয় আলাপে সবাই সন্তুষ্ট হয়। তাঁদের সান্নিধ্য লাভের জন্য প্রায় মানুষের ঔৎসুক্য জাগে। এই কারণে গৃহী-ভিক্ষু উভয় সমাজে বিনয়শীলে সুশিক্ষিত হওয়া একান্ত কর্তব্য।

মিথ্যাদি দোষবর্জিত বাক্য ভাষণ জ্ঞানিগণের ধর্ম। তাঁরা সর্বদা মিথ্যা, পিশুন, পরুষ ও সম্প্রলাপ বাক্য ভাষণ হতে বিরত থাকেন। ঐ বাক্য চতুষ্টয় একান্তই দোষাবহ; মিথ্যাদি বাক্য ভাষণ করতে মূর্খ ব্যক্তি গণের জিহ্বায় বাধে না। বাক্যদ্বারে যে কত মহাপাপ উৎপন্ন হয়, তা’ বলার অপেক্ষা রাখে না। জ্ঞানিগণ ঐসব সারহীন কথার অবতারণা করে সময়ের অপব্যবহার করেন না। তাঁরা যা বলেন তা’ একান্তই বিশ্বাস্য নির্দোষ স্পৃহনীয় মধুর সদর্থপূর্ণ পুরজনোচিত হৃদয়গ্রাহী ধর্মসংযুক্ত ও চিত্ত শান্তিকর।

জ্ঞানী ব্যক্তিগণ প্রথমে উত্তম সুভাষিত বাক্য ভাষণ করেন, দ্বিতীয়তঃ ধর্ম সংযুক্ত বাক্যই বলেন, অধর্ম বাক্য প্রয়োগ করেন না, তৃতীয়তঃ সকলের হৃদয়গ্রাহী মনোরঞ্জনকারী প্রিয় মধুর বাক্যই ভাষণ করেন, অপ্রিয় অমধুর কর্কশবাক্য কখনো বলেন না। চতুর্থতঃ যাবতীয় মিথ্যা-অলীক বাক্য ত্যাগ করে সত্য বাক্যই ভাষণ করেন। আচার্য শান্তিদেবের ভাষায় বলতে গেলে- প্রত্যক্ষে কারো গুণ কীর্তন না করিয়া পরোক্ষে করিবে। সদ্গুণের আলোচনা সন্তোষের সহিত অনুমোদন করিবে। নিজের প্রশংসায় উৎফুল্ল না হইয়া প্রশংসাকারীর গুণগ্রাহিতার কথা ভাবনা করিবে। নানা প্রকার গল্প গুজব যদি নানা বিচিত্রভাবে চলিতে থাকে এবং সকল কৌতুহলে যদি ঔৎসুক্য উৎপন্ন হইতে চায়, তবে সেই আগত ঔৎসুক্যকে দমন করিবে। যখন মন আÍপ্রশংসা ও পরনিন্দা পরায়ণ হইয়া ওঠে, অপরকে গালি দিতে চায় অথবা ঝগড়া করিতে চায় তখন কাষ্ঠবৎ পড়িয়া থাকিবে। সর্বদা অভ্রান্ত সুবিন্যস্ত পদযুক্ত স্পষ্ট অর্থজ্ঞাপক মনোরম শ্র“তিসুখকর দয়াপূর্ণ মৃদু-মন্দস্বরে বাক্য ভাষণ করিবে।

একদা বঙ্গীশ স্থবিরও ভগবানের সম্মুখে বলেছিলেন- তেমন বাক্যই কহিবে, যা’ নিজকে তপ্ত না করে। পরকে হিংসাত্মক বাক্য না বলে সুভাষিত বাক্যই বলিবে। সর্বদা অভিনন্দন যোগ্য হৃদয়গ্রাহ্য প্রিয় মধুর পাপ বর্জিত সত্য অমৃতপ্রদ কথাই কহিবে; সত্যে ধর্মে অর্থে প্রতিষ্ঠিত থাকা সাধু-সন্তগণের ধর্ম। ক্ষেম-নির্বাণ প্রাপক যেই বাক্য বুদ্ধ ভাষণ করেছেন- দুঃখান্তকারী তেমন উত্তম বাক্য ভাষণ করা সকলের উচিত। কিন্তু মূর্খগণ মুখের জোরে হাঁ-না অনেক বাক্য বলে থাকে। তারা কুঠারসম বাক্য ভাষণ করে পরকে জয় করতে ইচ্ছা পোষণ করে। ইহা বিজ্ঞ প্রশংসিত নয়। তাই বুদ্ধগণ বলে থাকেন-কর্কশভাষী পুরুষের মুখে স্বভাবতঃ তীক্ষ্ন ধারাল কুঠার উৎপন্ন হয়। সেই কুঠার মুখদ্বারা মূর্খগণ দুর্ভাষিত বাক্য ব্যয়ে নিজকে যেমন ছেদন করে, পরকেও সেভাবে তারা ছেদন করে। কুঠারসম কর্কশবাক্য দিয়ে ছেদন করা তাদের জন্মগত স্বভাব।

সূত্র ঃ বিশ্বমঙ্গল ও বিবিধ প্রসঙ্গ, শ্রী কোণ্ডাঞো ভিক্ষু।

 

সম্মন্ধে ela mutsuddi

এটা ও দেখতে পারেন

খুব সংক্ষেপে মহাসতিপট্ঠান সহায়িকা

একূশটি উপায়ে অরহ্ত্ত্ব লাভের উপায় তথা কর্মস্থান সংযূক্ত গভীর অর্থসংযুক্ত মহাসতিপট্ঠান সূত্তI এখানে একুশটি উপায়ে …

Leave a Reply