ব্রেকিং নিউজ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বুদ্ধ বন্দনা: সোনা কান্তি বড়ুয়া

sonakantibruya

বৌদ্ধ কাহিনী অবলম্বনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা নাটক (১) নটীর পূজা (২) শ্যামা (৩) চন্ডালিকা (৪) মালিনী (৫) রাজা (৬) অচলায়তন ও (৭) গুরু।   বাংলার বুক জুড়ে মাটির নীচে ও উপরে বুদ্ধমূর্তি বিরাজমান। বিশ্বকোষ (১৩শ ভাগ, পৃষ্ঠা ৬৫) থেকে একটি গৌরবোজ্বল ঐতিহাসিক উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হল, “কিয়ৎকাল পরে সিদ্ধার্থ গুরুগৃহে প্রেরিত হইলেন।  সেখানে তিনি বিশ্বামিত্র নামক উপাধ্যায়ের নিকট নানা দেশীয় লিপি শিক্ষা করেন। গুরুগৃহে গমনের পূর্বেই তিনি ব্রাহ্মী, … বঙ্গলিপি …সহ ৬৪ প্রকার লিপি অবগত ছিলেন।
গৌতমবুদ্ধের পাদপদ্মে সশ্রদ্ধ বন্দনা নিবেদন করে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন (সৌজন্য, দেশ, কলকাতা, ২ মে, ২০০৫, পৃষ্ঠা নং ৪১;  ভাষন, ১৮ মে, ১৯৩৫ সাল, ধর্মরাজিকা বিহার, কলকাতা মহাবোধি সোসাইটি),

“আমি যাঁকে আমার অন্তরের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব বলে উপলব্ধি করেছি আজ এই বৈশাখী পূর্ণিমায় তাঁর জন্মোৎসবে তাঁকে আমার প্রনাম নিবেদন করতে এসেছি, এ কোন বিশেষ অনুষ্ঠানে অর্ঘ নিবেদন নয়, যাঁকে নির্জনে বারংবার অর্ঘ নিবেদন করেছি, সেই অর্ঘই আজ নিবেদন করতে উপস্থিত হয়েছি।

“ওই নামে একদিন ধন্য হল দেশে দেশান্তরে
তব জন্মভূমি।
সেই নাম আরবার এ দেশের নগরে প্রান্তরে
দান কর তুমি।
বোধিদ্রুমতলে তব সেদিনের মহাজাগরণ
আবার সার্থক  হোক, মুক্ত হোক মোহ আবরণ,
বিস্মৃতির রাত্রিশেষে এ ভারতে তোমারে স্মরণ
নব প্রভাতে উঠুক কুসুমি।”

একদিন বুদ্ধগয়াতে বুদ্ধমন্দির দর্শনে গিয়েছিলুম। সেইদিন এ কথা মনে জেগেছিল – যে সময়ে ভগবানবুদ্ধের চরণস্পর্শে সমস্ত বসুন্ধরা জেগে ওঠেছিল, গয়াতে যেদিন তিনি স্বশরীরে উপস্থিত ছিলেন, সেদিন কেন আমি জন্মাই নি, কেন সেদিন অনুভব করিনি তাঁকে একান্তভাবে শরীর মন দিয়ে।…”
“যাঁরা প্রতাপবান, বীর্য্যবান তাঁদের সংখ্যা পৃথিবীতে বেশী নয়। অনেক মানব, রাজা, ধনী মানী ও রাষ্ঠ্রনেতা এ পৃথিবীতে জন্মেছে। কিন্তু সম্পূর্ণ মনুষ্যত্ব নিয়ে কতজন এসেছেন? যিনি সম্পূর্ণ মনুষ্যত্ব নিয়ে এসেছিলেন আবার তাঁকে আহ্বান করছি আজকে এই ছিন্ন বিচ্ছিন্ন ভারতে, যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের বিসম্বাদ, যেখানে ভেদ বিবাদে মানুষ জর্জরিত, সেই ভারতে তিনি আবার আসুন। সত্যের দ্বারা মানবের পূর্ণ প্রকাশ। যিনি আপনার মধ্যে সকল জীবকে দেখেন। তিনি স্বয়ং প্রকাশ। তিনি প্রকাশিত হবেন তাঁর মহিমার মধ্যে।”
জনতার প্রশ্ন: গৌতমবুদ্ধ বঙ্গলিপি অধ্যয়ণ করার পর ও গৌতমবুদ্ধের বুদ্ধবর্ষ বাদ দিয়ে বঙ্গাব্দ রচিত হল কেন? রবীন্দ্রনাথের ঠাকুর বৈদিক জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে বৌদ্ধধর্মের জয়গান গেয়ে চন্ডালিকা শীর্ষক নৃত্যনাট্য রচনা করেছিলেন এবং তিনি তাঁর ভারতীয় সমাজের কাছে বৌদ্ধধর্মের পতনের কারন সম্বন্ধে জবাবদিহি করেছেন,
“তাঁর (গৌতমবুদ্ধের) তপস্যা কি শুধু ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে ? ভারতের মাটিতে আজ তাঁর তপস্যা বিলুপ্ত হয়েছে। আমাদের অমূল্য ভান্ডারে দ্বার ভেঙ্গে গেছে। মানুষকে আমরা শ্রদ্ধা করিনে। আমাদের সেই প্রেম, মৈত্রী, করুণা, যা তাঁর দান, সব আমাদের গিয়েছে। তাঁর দানকে রুদ্ধ করেছি মন্দির দ্বার পর্যন্ত। এ জাতের কখনও মঙ্গল হতে পারে? তাঁকে বলা হয় শূন্যবাদী। তিনি কি শূন্যবাদী? তিনি বললেন, “জীবে দয়া কর।”  প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে বৌদ্ধ চিন্তাধারাপুষ্ঠ অশোক চক্র ভারতের জাতীয় পতাকা এবং জাতীয় এমব্লেম বা সরকারী স্মারক চিহ্ন রুপে বিরাজমান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, “তিনি (গৌতমবুদ্ধ) জন্মেছেন মানবের চিত্তে, প্রতিদিন তিনি জন্মাচ্ছেন, প্রতিদিন তিনি বেঁচে আছেন।” তবু ও ভারতে বৌদ্ধধর্ম সংখ্যা গরিষ্ঠের ধর্ম নয় কেন?
বুদ্ধপূর্ণিমা উপলক্ষে গৌতমবুদ্ধকে সশ্রদ্ধ বন্দনা নিবেদনের নৈবেদ্য সাঁজিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর “হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী ” গানটি (বুদ্ধ জন্মোৎসব ২১ শে ফাল্গুন, ১৩১৩ বঙ্গাব্দ) মহামানব বুদ্ধের নামে উৎসর্গ করেছিলেন,
“হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বি নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব
ঘোর কুটিল পন্থ তার লোভ জটিল বন্ধ।
নতুন তব জন্ম  লাগি কাতর যত প্রাণী
কর ত্রান মহাপ্রাণ আন অমৃত বাণী
বিকশিত করো প্রেম প্রদ্ম চিরমধু নিষ্যন্দ
শান্ত হে মুক্ত হে, হে অনন্ত পুণ্য
করুণাঘন ধরণীতল করহ কলংক শূন্য
এস দানবীর দাও ত্যাগ কঠিন দীক্ষা
মহাভিক্ষু লও সবার অহংকার ভিক্ষা।
দেশ দেশ পরিল তিলক রক্ত কলুষ গ্লানি
তব মঙ্গল শঙ্খ আন, তব দক্ষিন পাণি
তব শুভ সঙ্গীতরাগ, তব সুন্দর ছন্দ।
শান্ত হে মুক্ত হে, হে অনন্ত পুণ্য
করুণাঘন ধরনীতল করহ’ কলঙ্ক শূন্য।”
আইনের শাসনে ভারতের অজন্তা গূহায় “বিজয় সিংহ এর সিংহল অভিযানের স্বাক্ষর বিরাজমান (চিত্র নম্বর ৫৩)” সত্বে ও ১৪১৮ বঙ্গাব্দ লেখা অন্যায় ও অসঙ্গত। সিংহল অভিযানের প্রানপুরুষ বিজয় সিংহ এর জন্ম তারিখ বা তাঁর ঠিকুজি বঙ্গাব্দের বাইরে কেন? ইতিহাস তো ছেলের হাতের মোয়া নয়।  ২৬০০ বছর পূর্বে শ্রীলংকার মহাবংশ এবং দ্বীপবংশ শীর্ষক ঐতিহাসিক গ্রন্থদ্বয়ের মতে রাজা বিজয় সিংহ বাঙালি ছিলেন । আজ ১৪১৮ বঙ্গাব্দ লেখা হয় হিজরি (১৪৩২) সালকে বিকৃত করে। রবি ঠাকুরের ভাষায়,
“এশিয়া খন্ডে মানবের সে কীর্তি দেখলে বিস্মিত হতে হয়।  কেমন করে কোন ভাষায় বলব, তিনি এই পৃথিবীতে  এসেছিলেন, কেমন করে মানুষকে তাঁর বাণী বলেছেন, সেই স্মৃতিটুকু রাখবার জন্য মানুষ অজন্তার গুহা হতে শুরু করে কত না অসাধ্য সাধন করেছে। কিন্তু এর চেয়ে দুঃসাধ্য কাজ হয়েছে সেদিন, যেদিন সম্রাট অশোক তাঁর শিলালিপিতে লিখলেন বুদ্ধের বাণী।”
সম্প্রতি বাংলা নববর্ষ সম্বন্ধে বিবিধ প্রবন্ধ পড়ে আমরা জানতে পারলাম যে ১৫৫৬ খৃষ্ঠাব্দ থেকে মোগল সম্রাট আকবর কর্তৃক বাংলাদেশে বাংলা সন প্রচলিত হয়। প্রসঙ্গত: প্রতিবছর নববর্ষ উপলক্ষে ১৪ বা ১৫ই এপ্রিল জুড়ে থাইল্যান্ড, লাওস, বার্মা, ভারত, কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা, সিংগাপুর ও ইন্দোনেশিয়ায় “পানি খেলা সহ বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।  তবে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার জন্যে সোনার বাংলার অন্যতম শাসক মহাবীর ঈশা খাঁ সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহের সাথে মুখোমুখি যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন। বুদ্ধমূর্তি সম্রাট অশোক, পাল রাজত্বকাল এবং বাংলা ভাষার আদিমতম নিদর্শন চর্যাপদের না বলা ইতিহাসের অভিব্যক্তি “হে ইতিহাস কথা কও।”
হিন্দুরাজনীতি ভারতবর্ষে বৌদ্ধ ইতিহাস ধ্বংস করতে ‘ইসলামী সাল হিজরিকে’ চন্দ্র এবং সূর্য্য ক্যালেন্ডারের দোহাই দিয়ে সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে ‘আল্লাহ উপনিষদ রচনা’ সম্পাদন করার পর বঙ্গাব্দের মিথ্যা ইতিহাস রচনায় ষড়যন্ত্র করেছিল। হিন্দু রাজনীতি বাঙালি জাতির ঐতিহ্যকে বিপন্ন করে বৌদ্ধদের বুদ্ধগয়ার মহাবোধি মন্দির দখল  করার পর ১৯৯২ সালের ০৬ ডিসেম্বর ‘বাবরি মসজিদ ভেঙে’ রাম জন্মভূমি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছে। মা গঙ্গা সহ সূর্য্য দেব ও চন্দ্র দেবকে হিন্দু রাজনীতি দখল করে আছে। ভারতে অহিন্দুদের অস্তিত্ব সংকট প্রকট হয়ে ওঠেছে। রবি ঠাকুরের ভাষায়,
“সকল বর্ণের, সকল ধর্মের ছোট ছোট গন্ডী এড়িয়ে তিনি ছড়িয়ে পড়লন এই মহাবিশ্বে। সমস্ত  মরুক্ষেত্রের মধ্যে, দুর্লঙ্ঘ্য পর্বতের উপরে প্রস্তর মূর্তিতে ও ¯ত’পে স্তপে তাঁর বাণী রচিত হ’ল। তিনি মানুষকে বলেছিলেন সত্যকে উপলব্ধি করার জন্যে। কিন্তু সে সত্যকে কি সহজে পাওয়া যায়? তাই মানুষকত দুঃখ দিয়ে এবং কত কৃচ্ছ সাধন করে পর্বত শিখরে, মূর্ত্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের ভক্তিকে চরিতার্থ করেছে।”
চর্যাপদের আগে বাংলাভাষায় বৌদ্ধ ত্রিপিটক বৌদ্ধধর্মের সাথে হারিয়ে যাবার কথা ছিল না। ইতিহাসের উত্তমপুরুষ গৌতমবুদ্ধের সময় থেকে হিসাব করলে ও বাংলা বর্ণমালার বয়স প্রায় ২৬০০ বঙ্গাব্দ। হিন্দু শাসকগণ মুসলমান শাসকদের সাথে একত্রিত হয়ে হিজরি সালকে বিকৃত করার কথা ছিল না। শকাব্দকে হিন্দু রাজনীতি বুকে বেঁধে রাখার পর বঙ্গাব্দ থেকে বুদ্ধবর্ষ কে সরাতে হিন্দু রাজনীতি গভীর ষড়যন্ত্র করে (১৪৩২ হিজরি সালকে ১৪১৮ বঙ্গাব্দ) এবং ইসলামিক হিজরি সালকে বিকৃত করে বাংলার ইতিহাসকে হিন্দুভাবাপন্ন করে গড়ে তোলে। ১৯০৬ সালে নেপালের রাজকীয় গ্রন্থাগার থেকে চর্যাপদ আবিস্কার হওয়ার পর হিন্দুত্বের ঝুলি থেকে ষড়যন্ত্রের বেড়াল বের হয়ে প্রমানিত হলো “বাংলা ভাষা পালি ভাষার বিবর্তিত রুপ।” হিন্দুরাজনীতি কিন্তু গৌতমবুদ্ধকে তাঁদের নবম অবতার বানিয়ে মিথ্যা ইতিহাস রচনা করে  বৌদ্ধ ত্রিপিটককে (বুদ্ধবংশ) অস্বীকার করতে রামায়ণের অযোধ্যা কান্ডে (অধ্যায়ে) ৩২ বত্রিশ নম্বর শ্লোকে বৈদিক পন্থী হিন্দু পন্ডিতগণ বুদ্ধ এবং বৌদ্ধদেরকে যে ভাবে গালাগাল করেছেন তা অমানবিক এবং অধর্ম ।
বৌদ্ধধর্মের আলোকে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়:
হিন্দু বর্ণাশ্রম বিরোধী সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়  ব্রাহ্মণদের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ‘সাম্যবাদ’ নামক বই লিখেছিলেন এবং গৌতমবুদ্ধকে সশ্রদ্ধ বন্দনা নিবেদন করে ঘোষণা করলেন:
“তখন বিশুদ্ধাত্মা শাক্যসিংহ অনন্তকালস্থায়ী মহিমা বিস্তার পূর্বক, ভারতাকাশে উদিত হইয়া, দিগন্ত প্রসারিত রূপে বলিলেন, “আমি উদ্ধার করিব। আমি তোমাদেরকে উদ্ধারের বীজমন্ত্র দিতেছি, তোমরা সেই মন্ত্র সাধন কর। তোমরা সবাই সমান। ব্রাহ্মণ শুদ্র সমান। মনুষ্যে মনুষ্যে সকলেই সমান। সকলেই পাপী, সকলের উদ্ধার সদাচরণে। বর্ণ বৈষম্য মিথ্যা। যাগযজ্ঞ মিথ্যা। বেদ মিথ্যা, সূত্র মিথ্যা, ঐহিক সুখ মিথ্যা, কে রাজা, কে প্রজা, সব মিথ্যা। ধর্মই সত্য। মিথ্যা ত্যাগ করিয়া সকলেই সত্যধর্ম পালন কর। (বঙ্কিম রচনাবলী, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৮২ থেকে ৩৮৩, সাহিত্য সংসদ প্রকাশিত, কলকাতা)।”
জনতার প্রশ্ন: চর্যাপদের আগে বাংলা ভাষায় বিপুল বৌদ্ধ ত্রিপিটক কোথায় হারিয়ে গেল?
সিন্ধুসভ্যতায় (মহেঞ্জোদারো এবং হরপ্পা) বৌদ্ধধর্ম, দক্ষিন এশিয়ার সম্রাট অশোকের শিলালিপি, চর্যাপদ, সিদ্ধাচার্য এবং বাংলাভাষা, বাঙালি জাতীয় ঐতিহ্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বৈদিকপন্থী হিন্দুদের ঋগ্বেদে (১/৩৬/৮), বিরাজমান যদু (যাদব ও  ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রথম পূর্ব পুরুষ ) দূরদেশ থেকে ভারতে আসেন। যদুরা পর্শুর সন্তান (১০/৮৬/২৩)। প্রাচীনতম বেদ হল ঋগ্বেদ, যার পদ্যে রচিত সংহিতার দশটি মন্ডলে ১০২৮টি সূত্র আছে। ভগবান শিব, বিষ্ণু, ব্রহ্মা, ভগবতী কালী, দূর্গা (বা বোধিসত্ত্ব তারাদেবীর) এবং চন্ডীর কোন নাম নেই, এর বিপুল অংশ জুড়ে প্রধান দেবতা যুদ্ধ প্রিয় রাজা ইন্দ্রকে নিয়ে।
হিন্দু মন্দিরে গৌতম বুদ্ধের পূজা হয় না, অথচ বুদ্ধের শিক্ষালব্ধ “অহিংসা মহামন্ত্রকে হিন্দু মন্ত্র বানিয়ে’ হিন্দুরাজনীতি গৌতমবুদ্ধকে হিন্দুর ভগবান বা নবম অবতার করেছেন। হিন্দুরা বৌদ্ধধর্ম গ্রহন না করে বা বৌদ্ধ ধর্মালম্বী না হয়ে হিন্দু রাজনীতি গৌতমবুদ্ধকে হিন্দু বানিয়ে গোলে মালে আধুনিক সমাজের চোখে ধূলো দিচ্ছেন। হিহুদি জাতি বা রাজনীতি যীশুখৃষ্ঠকে হিহুদি করার সাহস না করলে ও হিন্দুরাজনীতি বৈদিক জাতিভেদ প্রথা অনুসরন করে ধর্মের নামে রাঠ্রের সিংহাসন লাভ করতে সম্রাট অশোকের মৃত্যুর পর বৌদ্ধধর্ম এবং  জাতিকে তিলে তিলে ধ্বংস করে চলেছে। ”
ব্রিটিশ পন্ডিত জেমস প্রিন্সেপ ভারতে এসে সম্রাট অশোকের শিলালিপি পড়তে পারলেন অথচ ভারতের ব্রাহ্মণ্যবাদী পন্ডিতগণ সিন্ধুসভ্যতার বৌদ্ধধর্ম ও অতীত বুদ্ধগণের অস্তিত্ব স্বীকার না করে ১৮৩৭ সালে সম্রাট অশোকের শিলালিপি পড়তে না পেরে ইতিহাস চুরির চাতুর্য হাতে নাতে ধরা পড়ে গেল।
হিন্দুরাজনীতি বৌদ্ধধর্মের ত্রিপিটক যে কোন ভারতীয় ভাষায় প্রকাশ করার কোন উদ্যোগ ছিল না। তবে হিন্দু পন্ডিতগণ ১৮৩৭ সালে অশোকের শিলালিপি পড়তে না পারলে ও ডঃ আশা দাশ সহ অনেক হিন্দু লেখক ও লেখিকাগণ বৌদ্ধধর্মের অনুরাগী গবেষক হয়ে বৌদ্ধ জাতক এবং বৌদ্ধ সাহিত্য সম্বন্ধে গবেষণা করে রামায়ণী বা বৈদিক ভাবধারাকে আবিষ্কার করেন। বৌদ্ধদের শ্রেষ্ঠতম তীর্থভূমি “বুদ্ধগয়া দখল করে” মন্দিরের দান বাক্সকে হিন্দুরাজনীতির অধীনে বন্দী করে রেখে ভারতীয় বৌদ্ধদের অস্তিত্বকে সমূলে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। বৈদিক পন্থীরা মিথ্যা ইতিহাস বানিয়ে বৌদ্ধ সভ্যতাকে গ্রাস করে ফেলেছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়:
সমস্ত বিশ্বের মূলে কোন অতীন্দ্রীয় শক্তি আছে কি না তা আমি বলব না, তোমরা স্বার্থ থেকে, বন্ধন থেকে মুক্ত হও।” এর চেয়ে বড় আধ্যাত্মতত্ত্ব কি আছে জানি নে। তাঁর মূলকথা, মানুষকে শ্রদ্ধা কর, মানুষকে ক্ষমা কর, অসাধুতা জয় করতে হবে সাধুতা দ্বারা, ক্রোধকে জয় করতে হবে, অক্রোধ দ্বারা। বাসনা, তৃষ্ণা মানবের চরম ধর্ম নয, এ গুলিতে মানুষ সত্যভ্রষ্ঠ হয়। ক্ষমা আমরা করতে পারি নে কেন? কারন ক্ষমা করতে চাইলেই আমাদের অন্তরে অহং উত্তেজিত হয়ে ওঠে। আজকের দিনে সমস্ত সমস্যার মূলে এই বাণীর অভাব, অক্রোধের দ্বারা ক্রোধকে জয় কর।”
গৌতমবুদ্ধ তো বৈদিকধর্মের উত্তরাধিকারী নয়। গৌতমবুদ্ধের পূর্বে দেবভাষা বা সংস্কৃত ভাষার কোন লিপি ছিল না। বাংলাভাষা সংস্কৃত ভাষা থেকে জন্ম নেয়নি, অশোকের শিলালিপির ভাষা ব্রাহ্মলিপি (প্রায় ৪০ টা ভাষায় বর্ণমালার জনক),  অনুসরন করে দেবনাগরী লিপি বা বর্ণমালা প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রাহ্মণ্য সভ্যতা সর্বদা বৌদ্ধসভ্যতাকে (অশোক চক্র বা বৌদ্ধদের ধর্মচক্র) আত্মস্থ করে সর্ব ভারতীয় বা হিন্দু সভ্যতার মিথ্যা ইতিহাস নিয়ে বিরাজমান। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়,
“বর্তমানের পরিধি অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ। এই ক্ষুদ্র পরিসরের মধ্যে তাঁকে উপলব্ধি করতে পারা যায় না। কিছুদিন পুর্বে তাঁর জীবন কথায় পড়েছিলুম – সে যুগের কথা। সেদিন ছিল কথায় বিরোধ, চিন্তায় বিরোধ। সেদিন তাঁকে খর্ব্ব করতে, তাঁর চরিত্রে কলঙ্ক আরোপ করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু যাঁরা মহাপুরুষ, তাঁরা কোন ক্ষুদ্র কালে আসেন না। বর্তমানকে উপলক্ষ করে তাঁরা জন্মান না, মহাযুগের মধ্যে তাঁদের আবির্ভাব, ক্ষুদ্র বর্তমানের মধ্যে তাঁদের আবির্ভাব সম্ভব নয়।  সুদূর জাপানের এক মৎস্যজীবি সেদিন এই বোধিদ্রুমমূলে কাতরভাবে তার পাপ বিমোচনের জন্য প্রার্থনা করেছিল, বুদ্ধদেবের চরনতলে  লুটিয়ে  পড়েছিল, সেদিন ও বুঝেছিলুম তাঁর জন্ম ক্ষুদ্র কালের মধ্যে নয়।”
সমস্ত ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতিতে লিপির কোন স্থান নেই। সরস্বতি বাগদেবী লিপির দেবী নয়। তাই কলকাতা কেন্দ্রীয় (ইম্পেরিয়াল) লাইব্রেরীতে গৌতম বুদ্ধের ছবি বিরাজমান। অধিকন্তু প্রাচীন কালের ব্রাহ্মণ্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি লেখাকে নরকের দ্বার স্বরূপ ফতোয়া জারি করে সাধারণ মানুষের মৌলিক জনশিক্ষার অধিকার হরণ করেছিলেন। এই অন্ধকার যুগে একমাত্র গৌতমবুদ্ধই লোভী ব্রাহ্মণদের ব্রাহ্মণ্যবাদী দলিত ঐতিহ্য ও সভ্যতা বিকৃতির হাত থেকে দক্ষিন এশিয়ার জনগণকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন।
অষ্টবিংশতি বুদ্ধবন্দনার আলোকে সিন্ধুসভ্যতায় বৌদ্ধধর্ম
খৃষ্ঠপূর্ব ১৫০০ বছর পূর্বে ঋগে¦দের (১/১০৫/৮ ও ১০/৩৩/২) মতে বৈদিক ধর্ম পন্থী আর্য্যদের রাজা ইন্দ্র মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার প্রাগৈতিহাসিক বৌদ্ধধর্ম ধ্বংস করেন।
গৌতমবুদ্ধের বুদ্ধপূর্ণিমার আলোকে (বুদ্ধবংশ, মধ্যম নিকায়ের সূত্র নম্বর ৭৫, মাগন্দিয় সূত্র এবং সংযুক্ত নিকায়ের নিদান সংযুক্তের নিদান বর্গ),  বৈদিক জাতিভেদ প্রথা ও ব্রাহ্মণভিত্তিক সভ্যতার বিরুদ্ধে গৌতমবুদ্ধের বিশ্বমৈত্রীর প্রাৗগতিহাসিক বৌদ্ধধর্মের সন্ধান আমরা সিন্ধু সভ্যতায় খুঁজে পেয়েছি স্বপন বিশ্বাসের লেখা ৩৯০ পৃষ্ঠার বই (ইংরেজিতে : মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পায় বৌদ্ধধর্ম), সহ বিভিন্ন গবেষনার মাধ্যমে।
বিভিন্ন গবেষণার পর পন্ডিতেরা স্বীকার করেছেন যে, আজকের বাংলাভাষা পালিভাষার বিবর্তিত রূপ।  বাংলাদেশে অষ্ঠাদশ শতাব্দিতে বাংলা ভাষায় কোন বৌদ্ধগ্রন্থ খুঁজে না পাওয়ার কারন কি ছিল? বৌদ্ধ পাল রাজাদের প্রতিষ্ঠিত বিক্রমশীলা ও ওদন্তপুরী বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ কোথায় হারিয়ে গেল? প্রসঙ্গত: ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী সেনাগণ বাংলাদেশের শহীদ মিনার ভেঙে ফেলার মতো বখতিয়ার খিলজির তুর্কী সেনাগণ পরম উৎসাহে বৌদ্ধ বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয়কে গঙ্গাগর্ভে ডুবিয়ে দিল। ভারত সরকার কর্তৃক ইংরেজী ভাষায় মূল্যবান “দি ওয়ে  ওব দি বুদ্ধ” শীর্ষক গ্রন্থে গৌতমবুদ্ধের আগের (১) কনকমুনি বুদ্ধ এবং (২) কাশ্যপবুদ্ধের নাম সম্রাট অশোকের শিলালিপিতে সগৌরবে বিরাজমান। রবি ঠাকুরের ভাষায়,

“মানবের দুঃখ দূর করার জন্য তিনি জন্ম নিয়েছেন। রাজাধিরাজ অথবা রাজপ্রতিভূরুপে তিনি হয়ত প্রভূত সন্মান পেতেন। কিন্তু সে সন্মান কালের সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্ত হ’ত। বর্তমানের আদর্শ মানুষকে খর্ব্ব করে। রাষ্ঠ্র নেতাকে ক্ষুদ্র বর্তমানের মধ্যে দেখা যায়। কিন্তু মহা পুরুষদেরকে দেখতে গেলে মহাযুগের মধ্য দিয়ে দেখতে হয়, গভীর অতীতের মধ্য দিয়ে যাঁর পাশে বর্তমান সংলগ্ন রয়েছে। তিনি সমস্ত মানবের চিত্তের মধ্যে জন্ম নিয়েছেন, বর্তমানে তাঁর আসন রচনা হচ্ছে, ভাবী কালেও তাঁর আসন রচিত থাকবে।”
তাই প্রাগৈতিহাসিক বৌদ্ধদর্শনের বিভিন্ন প্রসঙ্গ বৈদিক সাহিত্যে বিরাজমান এবং প্রাচীন উপনিষদের বিভিন্ন উপদেশ বৌদ্ধধর্ম থেকে নকল করা হয়েছে বলে গৌতমবুদ্ধ ত্রিপিটকের (মধ্যম নিকায়ের ৭৫ নন্বর) মাগন্দিয় সূত্রে ব্যাখ্যা করেছেন।  বৈদিক উপনিষদ সাহিত্য সহ বিভিন্ন পুরাণ কাহিনীতে বৌদ্ধধর্মকে নকল করে হিন্দুধর্ম করা হয়েছে ।
বিতর্কিত বঙ্গাব্দের ইতিহাস প্রসঙ্গে গৌতমবুদ্ধের বঙ্গলিপি অধ্যয়ন:
প্রথমে বুদ্ধাব্দ সন (গৌতমবুদ্ধের নামে) ভারতীয় পঞ্জিকা থেকে সরাতে সম্রাট আকবরের রাজসভায় হিন্দু পন্ডিতগণ “ আল্লাহ উপনিষদ ” রচনা করে সম্রাটের শুভদৃষ্ঠি আকর্ষন করেন। বৌদ্ধ ইতিহাস চুরি, ইতিহাসের অপব্যাখ্যা, মনগড়া ইতিহাস তৈরীর ব্যাপারে হিন্দুত্ববাদীদের জগন্য চাতুরীর ইতিহাস লিখতে গেলে একটি মহাভারত লিখতে হয়। কথায় বলে, ‘ঢ়ুরি তো চুরি তার উপর ছিনাজুড়ি।’ প্রসঙ্গত: ১৯৪৮ সালে কায়দে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহের ষড়যন্ত্রে ইসলাম ধর্ম রক্ষার নামে বাংলা ভাষা বাদ দিয়ে উর্দূ ভাষা বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হলে বিশ্বমানচিত্রে বাঙালি জাতি কি কোথায় হারিয়ে যেতো? তা ভাবতে  ও  বাঙালির গা শিউরে ওঠে! কবি গুরুর ভাষায়,
অশোক তাঁর বীরত্বের অভিমান, রাজত্বের অভিমান দিয়েছিলেন ধূলায় লুটিয়ে। এতবড় রাজা কখনও পৃথিবীতে এসেছেন কি? কিন্তু সেই রাজাকে রাজাধিরাজ করল কে? সেই গুরু। জাতিতে জাতিতে ভেদ, বিসম্বাদ পূর্ণ, হিংসায় ভরপুর ও পঙ্কিল এই জাতিকে কি শুধু রাষ্ঠ্রনীতি দ্বারা রক্ষা করা যাবে? যিনি এসেছিলেন, তিনি আবার আসুন, উপনিষদের সেই বাণী নিয়ে। উপনিষদ বলছে, “কো ধর্ম্মভূতে দয়া, সমস্ত জীবের প্রতি দয়া, শ্রদ্ধও দয়া। শ্রদ্ধয়া দেয়ম, ধিয়া দেয়ম। অশ্রদ্ধা করে দান করলে সে দান কলুষিত হয়। যেখানে মানুষ মানুষকে অপমান করে, সেখানে কি মানুষ রাষ্ঠ্রনীতিতে সিদ্ধিলাভ করতে পারে?
দীনতম দীনের দুঃখ বিমোচনের জন্য তিনি সর্বত্যাগ করেছিলেন। সমস্ত মানুষকে একান্তভাবে জেনেছিলেন বলেই তিনি সত্য।”
১২০১ খৃষ্ঠাব্দে বখতিয়ার খিলজির বাংলাদেশ আক্রমন করার পর এইভাবে বৌদ্ধ পালরাজাদের বুদ্ধাব্দ, বৌদ্ধজাতি কোথায় হারিয়ে গেল?  বুদ্ধপূর্ণিমার নাম ছিল বৈশাখী পূর্ণিমা এবং থাইল্যান্ড, লাওস, বার্মা, কম্বোডিয়া, শ্রীলংকা সহ বৌদ্ধবিশ্বে “ বৈশাখ বা থাই ভাষায় বিশাখা পূজা ” নামে আজ ও বিরাজমান। বুদ্ধজয়ন্তীর বৈশাখ মাস দিয়ে বাংলা মাস শুরু হয় এবং প্রাচীন বাংলা সহ বৌদ্ধ বিশ্বের পঞ্জিকায় আজ ২৫৫৩ বুদ্ধাব্দ। রাতারাতি ইতিহাস তৈরী হয় না। ভবিষ্যতে বুদ্ধাব্দ থেকে বঙ্গাব্দ লেখা হবে। ১৪১৭ নববর্ষ উপলক্ষে টরন্টোর ওমনি ২ এর “আমন্ত্রন নামক বাঙলা টিভি ” বৌদ্ধধর্মের বিভিন্ন পরম পূজনীয় দৃশ্যদিয়ে তাঁদের “নববর্ষের মঙ্গলাচরন অনুষ্ঠান” শুরু করেন।
বাঙালি ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বুদ্ধমূর্তি কি কেবলই ছবি? বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়,
“এই জগতের অধিকাংশ মানুষ আজ আচ্ছন্ন, তারা প্রকাশিত হয়নি। সূর্যের আলো প্রবেশের পুর্বেই এই সুন্দরী পৃথিবীর সবকিছু যেমন আচ্ছন্ন ছিল, তেমনিতর আজকের দিনে মানুষ সমস্ত মানুষ আচ্ছন্ন, আপনার ক্ষুদ্র স্বার্থের দ্বারা। যাঁরা সত্যকে পেয়েছেন, তাঁরা প্রকাশ পেয়েছেন। যেমন সূর্য নিজেকে প্রকাশ করে সঙ্গে সঙ্গে এই পৃথিবীকে ও প্রকাশিত করেন, তেমনিতর মহাপুরুষগণ ও ভগবান তথাগত যখন প্রকাশিত হলেন তখন এই ভারতবর্ষ ও প্রকাশিত হ’ল পৃথিবীর কাছে। ভারত তখন আপনার সত্যবাণী প্রকাশ করলে।
আফগানিস্তানের বামিয়ান পর্বতমালা খেকে রাজশাহীর পাহাড়পুর এবং নরসিংদীর উয়ারী বটেশ্বরে আবিস্কৃত হলো লক্ষ লক্ষ বুদ্ধমূর্তি। মিশরের মুসলমানগণ তাঁদের পূর্বপুরুষগণের পিরামিডকে নিয়ে গর্ববোধ করেন। গৌতমবুদ্ধের বোরোবুদুর পূজনীয় ধর্মস্থান ইন্দোনেশিয়ার মুসলমানদের কাছে “জাতীয় ঐতিহ্যের সুতিকাগার।” বাংলা বিশ্বকোষে রাজপুত্র সিদ্ধার্থের (গৌতমবুদ্ধ) বঙ্গলিপি অধ্যয়ন করার ঐতিহাসিক প্রমান বিরাজমান।
বাংলা বর্ণমালার বয়স ২৫৫৫ বছর এবং গৌতমবুদ্ধের মূর্তির মধ্যে বাংলা বর্ণমালা এবং বাঙালির অস্তিত্বের বয়স নিহিত আছে। পরিবর্তনশীল জগতে আরবীয় রাজনীতির পূর্বে সম্রাট ধর্মপাল এবং রাজা বল্লালসেন বাংলাদেশের জনগণমনের অধিনায়ক ছিলেন। গণতন্ত্রের আলোকে বৌদ্ধদের বুদ্ধবর্ষ সম্বদ্ধে কোন আলোচনা ব্যতীত ৫৯৮ হিজরী মুতাবিক ১২০১ সালে বখতিয়ার খিলজী কর্তৃক বাংলা বিজয় হলে রাজকর্মে এই হিজরী সন ব্যবহার হতে থাকে বাঙালি সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত এবং সম্রাট অশোকের  শিলালিপির ইতিহাস অস্বীকার করে। পবিত্র কোরানের সূরা নাসে বলা হয়েছে, “হে আল্লাহ, তুমি ‘খান্নাছের ওয়াসওয়াসা’ (শয়তানের কুমন্ত্রণা) থেকে আমাকে মুক্ত রাখো।”
হিন্দুত্ববাদীদের ইতিহাস চুরির চাতুর্যে ভারতে বৌদ্ধধর্ম দখল:
গৌতমবুদ্ধের (রাজপুত্র সিদ্ধার্থ) বুদ্ধত্বলাভের পূত পবিত্র ধ্যানভূমির নাম বুদ্ধগয়ায় “মহাবোধি মন্দির” আজ হিন্দুত্ববাদীরা শত শত বছর ধরে দথল করে আছে। হিন্দু শাসক ও ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের ইতিহাস চুরির চাতুর্যে বিষ্ণুপুরাণে বুদ্ধকে বলা  হয়েছে ‘মহামোহ’, “মনুসংতিা” এবং বিভিন্ন পুরান সাহিত্য রচনা করে বুদ্ধগয়া দখল করে আছে এবং  গৌতমবুদ্ধকে হিন্দুর নবম অবতার বানিয়ে জাপান, থাইল্যান্ড, চীন সহ বৌদ্ধবিশ্ব থেকে মনের সুখে “টাকা আনা পাই” কামাচ্ছে। কৌটিল্য বিধান দিয়েছেন যে, ভোজনে যদি বৌদ্ধ শূদ্র প্রভুতির ব্যবস্থা হয়ে তবে জরিমানা দিতে হবে ১০০ পণ।
মানবাধিকারের আলোকে বঙ্গলিপির বয়স কত জানার অধিকার বাঙালি পাঠকদের অবশ্যই আছে। বাংলাভাষা থেরবাদী পালি ভাষার বিবর্তিত রূপ।  বৌদ্ধধর্ম, বাংলা ভাষা ও জাতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিনত হয়েছে রাজপৃত্র সিদ্ধার্থের (গৌতমবুদ্ধ) বঙ্গলিপি অধ্যয়ন এবং ১৯০৭ সালে নেপালের রাজকীয় লাইব্রেরী থেকে মহামহোপধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কর্তৃক  চর্যাপদ আবিস্কারের মাধ্যমে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়,
“মানবের দুঃখ দূর করার জন্য তিনি জন্ম নিয়েছেন। রাজাধিরাজ অথবা রাজপ্রতিভূরুপে তিনি হয়ত প্রভূত সন্মান পেতেন। কিন্তু সে সন্মান কালের সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্ত হ’ত। বর্তমানের আদর্শ মানুষকে খর্ব্ব করে। রাষ্ঠ্র নেতাকে ক্ষুদ্র বর্তমানের মধ্যে দেখা যায়। কিন্তু মহা পুরুষদেরকে দেখতে গেলে মহাযুগের মধ্য দিয়ে দেখতে হয়, গভীর অতীতের মধ্য দিয়ে যাঁর পাশে বর্তমান সংলগ্ন রয়েছে।
তিনি সমস্ত মানবের চিত্তের মধ্যে জন্ম নিয়েছেন, বর্তমানে তাঁর আসন রচনা হচ্ছে, ভাবী কালেও তাঁর আসন রচিত থাকবে। পাপী যে, জানে না সে, কোথায় তার দুঃখ দূর হবে। এই যে মানব, তারা তাঁর কাছে এসেছে কেন? তিনি সমস্ত মানবের মুক্তির জন্য এসেছিলেন। এই জন্যই মানব আজ ও তাঁর কাছে আসে।”
গৌতমবুদ্ধকে বাদ দিয়ে বঙ্গাব্দ শুরু হল কেন?
বাংলাদেশে মাটির নীচে, উপরে, ঘরে ও বাইরে বুদ্ধমূর্তি বিরাজমান অথচ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের চরম বিকৃতির মতো বুদ্ধাব্দ বাদ দিয়ে তৎকালিন হিন্দু ও মুসলমান  শাসকগণ বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন প্রচার করেছিলেন।  আমরা সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতায় শ্রীলঙ্কা বিজয়ী সর্বপ্রথম বঙ্গবীর বিজয় সিংহ সম্বন্ধে পড়েছি , যিনি ২৫৫৫ বছর পূর্বে শ্রীলংকা জয় করে “সিংহল” নামে রাজ্য শাসন করতেন। গৌতমবুদ্ধের শিক্ষা প্রচারে  পৃথিবীর সর্বপ্রথম বাংলা বইয়ের নাম “চর্যাপদ।” এই বইয়ের অনুবাদ তিব্বতী ভাষায় বিরাজমান। বিশ্বশান্তি ও বৌদ্ধধর্ম প্রচারে একাদশ শতাব্দীতে অতীশ দীপংকর তিব্বত গমন করেন। তবে হিন্দু শাসক ও পন্ডিতগণ বাংলা সন ও বর্ণমালা আলোকিত বাংলাদেশের প্রতিশ্রতি।
অহিংসা দিয়ে মনুষ্যকে জয় করা যায়। ক্রোধ দিয়ে ক্রোধকে জয়া করা যায় না। বিশ্বকবির বাণীতে মানুষকে ভালবাসতে শিখুন,
“মৃত্যু কহে ‘পুত্র নিব’ চোর কহে ধন,
ভাগ্য  কহে সব নিব যা তোর আপন
নিন্দুক কহিল লব তব যশোভার
কবি কহে ‘কে লইবে আনন্দ আমার!”
সৌরজগত জুড়ে প্রকৃতির অহিংসা পরম ধর্মের মহাবিস্ময়। তবে মানব মনে অতল সাগর বিরাজমান। বুদ্ধ নামক গ্রহে কি মানব জাতির জন্ম? আজ বুদ্ধ পূর্ণিমার আলোকে পৃথিবী উদ্ভাসিত। ১৩৩৮ বঙ্গাব্দে “ বৈশাখী পূর্ণিমা ” শীর্ষক কবিতায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৌদ্ধকবি হয়ে লিখেছিলেন,
“সকল কলুষ তামস হর’ জয় হোক তব জয়!
অমৃক বারি সিঞ্চন কর ’ নিখিল ভুবন ময়।
জয় হোক তব জয়!
মহাশান্তি মহাক্ষেম,
মহা পুণ্য, মহা প্রেম!”
জ্ঞানসূর্য উদয় ভাতি
ধ্বংস করুক তিমির রাতি,
দুঃসহ দুঃস্বপ্ন ঘাতি ’ অপগত কর ভয়।
জয় হোক তব জয়।
মোহ মলিন অতি দুর্দ্দিন, শঙ্কিত চিত্ত পান্থ,
জটিল গহন পথ সঙ্কট সংশয় উদভ্রান্ত।
করুনাময়, মাগি শরন,
দুর্গতিভয় করহ হরণ;
দাও দুঃখ বন্ধ  তরণ মুক্তির পরিচয় ।
জয় হোক তব জয়।
মহাশান্তি মহাক্ষেম
মহাপুণ্য, মহাপ্রেম।”
বাংলা বর্ণমালা গৌতমবুদ্ধ অধ্যয়ন করার পর  ও  আজ  1423 বঙ্গাব্দ কেন?    এখন আমাদের প্রশ্ন: তুরস্ক ও আরবের মুসলমান শাসক (নাদির শাহ ও বকতিয়ার খিলজি) ও যোদ্ধগণ কি শুধু বৌদ্ধধর্ম এবং বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ ধ্বংস করতে ভারতে এসেছিলেন? দক্ষিন এশিয়ায় সম্রাট অশোকের প্রচারিত গৌতমবুদ্ধের বৌদ্ধধর্ম হিন্দুত্ববাদীদের ইতিহাস চুরির চাতুর্য ও রক্তাক্ত সাম্প্রদায়িক জোয়ারে কোথায় হারিয়ে গেল? হাজার বছর যাবত ভারতে দুঃখের দহনে করুন রোদনে তিলে তিলে ক্ষয় হচ্ছে ২৫ কোটি দলিত জনগণ। লাখো দলিত প্রতি বছর বৌদ্ধধর্ম গ্রহন করে “বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি ” উচ্চারণ করছেন হিন্দুত্বের জাত পাঁতের খাবা খেকে রক্ষা পেতে।  বাংলা ভাষা পালি ভাষার বিবর্তিত রূপ।
ইউরোপে নাৎসিদের হাতে ইহুদি নির্যাতনের মতো ভারতে (দক্ষিন এশিয়া) ব্রাহ্মণ শাসক পুষ্যমিত্র (খৃষ্ঠপূর্ব ১০০), রাজা শশাঙ্ক (৭ম শতাব্দী), ও শংকরাচার্য (৮ম শতাব্দী), সহ হিন্দুত্ববাদীদের হাতে  বৌদ্ধ জনগণ ও দলিত নির্যাতন সহ বৌদ্ধ হত্যাযজ্ঞের ইতিহাস লেখা হলে  পাঠকগণ দেখবেন, তা হলোকাষ্টের চেয়ে কম বীভৎস নয়।  হিন্দুত্ববাদীরা মুখে বলে তারা ধমীয় দল, আসলে তারা একটি ফ্যাসিষ্ঠ দল হয়ে আজ বৌদ্ধদের সবচেয়ে পবিত্র তীর্থভূমি বুদ্ধগয়ায় “ মহাবোধি মন্দির ” হাজার হাজার বছর পর্যন্ত দখল করে আছে। রাজা শশাঙ্ক ৭ম শতাব্দীতে বুদ্ধগয়ায় মহাবোধি মন্দিল দখল করে বোধিবৃক্ষ ধ্বংস করার ইতিহাস চীনা পরিব্রাজক ইউয়েন সাং তাঁর ভ্রমন কাহিনীর ইতিহাসে লিপিবদ্ধ করে গেছেন।
প্রায় ২৬০০ বছর পূর্বে রাজপুত্র সিদ্ধার্থ (গৌতমবুদ্ধ) বাল্যকালে যে বাংলা লিপি অধ্যয়ন করেছিলেন এর ঐতিহাসিক প্রমান বাংলা বিশ্বকোষের ১৩শ ভাগ, ৬৫ পৃষ্ঠায় সগৌরবে লিপিবদ্ধ আছে। রবি ঠাকুরের ভাষায়,
“সমস্ত বিশ্বে আজ এ বাণী পৌঁছেছে , ইউরোপেও। ইউরোপ আজ বড় দুঃখে পীড়িত, হিংসায় শতধা বিভক্ত। কোন রাজনৈতিক কলে (পন্থায়) শান্তি তৈরী করা যেতে পারে না, ইউরোপ তা বোঝে না। শান্তি ম্যাঞ্চেষ্টারের কল এ তৈরী করা কাপড়ের মত কিছু হতে পাওে না, এই যে মানুষের মন নিয়ে খেলা। ইউরোপকে একবার প্রাচ্যেও দিকে তাকাতে হবে, যেখানে সত্য রয়েছে, সেখানে কবে মানুষের দৃষ্ঠি পড়বে?বড় দুঃখে আমরা অনেক দিনের পাপ বহন করে এসেছি , এই মানুষকে অপমান করে। তিনি আমাদের এই ভেদ বুদ্ধি থেকে রক্ষা করুন। পার্লামেন্টারী বিধি নিয়মে, অথবা ভোট নেবার কোন এক কৌশলে অন্তরের মধ্যে বিষ পোষণ করে, কলের (যন্ত্র) সৃষ্ঠ শান্তি আমাদের ধর্ম নয়। ধর্ম হইতেছে জীবে দয়া, মানুষে শ্রদ্ধা।”
রবি ঠাকুরের ভাষায়,

“কেমন করে কোন ভাষায় বলব, তিনি (গৌতমবুদ্ধ) এই পৃথিবীতে  এসেছিলেন, কেমন করে মানুষকে তাঁর বাণী বলেছেন, সেই স্মৃতিটুকু রাখবার জন্য মানুষ অজন্তার গুহা হতে শুরু করে কত না অসাধ্য সাধন করেছে। কিন্তু এর চেয়ে দুঃসাধ্য কাজ হয়েছে সেদিন, যেদিন সম্রাট অশোক তাঁর শিলালিপিতে লিখলেন বুদ্ধের বাণী। অশোক তাঁর বীরত্বের অভিমান, রাজত্বের অভিমান দিয়েছিলেন ধূলায় লুটিয়ে। এতবড় রাজা কখনও পৃথিবীতে এসেছেন কি? কিন্তু সেই রাজাকে রাজাধিরাজ করল কে? সেই গুরু। জাতিতে জাতিতে ভেদ, বিসম্বাদ পূর্ণ, হিংসায় ভরপুর ও পঙ্কিল এই জাতিকে কি শুধু রাষ্ঠ্রনীতি দ্বারা রক্ষা করা যাবে? যিনি এসেছিলেন, তিনি আবার আসুন, উপনিষদের সেই বাণী নিয়ে। উপনিষদ বলছে, “কো ধর্ম্মভূতে দয়া, সমস্ত জীবের প্রতি দয়া, শ্রদ্ধা ও দয়া। শ্রদ্ধয়া দেয়ম, ধিয়া দেয়ম। অশ্রদ্ধা করে দান করলে সে দান কলুষিত হয়। যেখানে মানুষ মানুষকে অপমান করে, সেখানে কি মানুষ রাষ্ঠ্রনীতিতে সিদ্ধিলাভ করতে পারে?”

সম্মন্ধে vuato2

এটা ও দেখতে পারেন

খুব সংক্ষেপে মহাসতিপট্ঠান সহায়িকা

একূশটি উপায়ে অরহ্ত্ত্ব লাভের উপায় তথা কর্মস্থান সংযূক্ত গভীর অর্থসংযুক্ত মহাসতিপট্ঠান সূত্তI এখানে একুশটি উপায়ে …

Leave a Reply