ব্রেকিং নিউজ

জীবন চক্র- প্রতীত্য সমুৎপাদ নীতি

প্রতীত্য সমুৎপাদ নীতি হচ্ছে ভগবান বুদ্ধ কর্তৃক দেশিত পুনর্জন্মের প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ তত্ব । এ নীতিকে কার্য-কারণ তত্ত্বও বলা হয় । প্রতীত্য মানে প্রত্যয়, হেতু বা কারণ এবং সমুৎপাদ অর্থ সম বা সহ উৎপত্তি । প্রতীত্য সমুৎপাদ হচ্ছে কারণ সহযোগে ধর্মসমূহের উৎপত্তি। এখানে ধর্মসমূহ বলতে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু বা বিষয়কে বুঝানো হচ্ছে। ছয় বৎসর কঠোর সাধনার পর বুদ্ধ তথাগত অনুত্তর সম্যক সম্বোধিজ্ঞান প্রাপ্ত হন। তিনি সম্বুদ্ধ চিত্তে জড়-জগৎ (রপক্কন্ধ) ও মনোজগতের (নাম স্বন্ধ) মধ্যে কোন নিত্য স্থায়ী সত্ত্ব বা আত্মা বলে কিছু দর্শন করলেন না, তিনি দেখলেন কার্য-কারণ সম্বন্ধযুক্ত কর্মপ্রবাহ। এ এক অপূর্ব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার । জড় ও মনোজগৎ সম্বন্ধে বর্তমান বিজ্ঞানীদেরও একই অভিমত । এ মহাসত্য তিনি সংক্ষেপে এভাবে প্রকাশ করেনঃ ওটা থাকলে এটা হয়, ওটার উৎপত্তিতে এটার উৎপত্তি হয় । ওটা না থাকলে এটা হয় না, ওটার নিরোধে এটার নিরোধ হয় । হেতুর উৎপত্তিতে ফলের উৎপত্তি, হেতুর নিরোধে ফলের নিরোধ । এটাই প্রতীত্য সমুৎপাদ নীতির মূল সুত্র। এক কথায় বলা যায়-এ নীতি জীবের পুনর্জন্মের কারণ তত্ব । যার জন্ম আছে, তার মৃত্যুও আছে। যার জন্ম নেই, তার মৃত্যুও নেই। পুনর্জন্ম থাকলেই নানাবিধ দুঃখোৎপত্তি হবেই। যদি পুনর্জন্ম রোধ করা যায়, তাহলে সর্বপ্রকার দুঃখেরও মূলোচ্ছেদ করা সম্ভব । তাই বলা যায় এ নীতি সর্বপ্রকার দুঃখ-উৎপত্তি তত্ব কিংবা দুঃখ-বিমুক্তি তত্ব । তত্তের দ্বাদশ অঙ্গ । যথা-১. অবিদ্যা ২. সংস্কার ৩. বিজ্ঞান ৪. নামরূপ ৫. ষড়ায়তন ৬. স্পর্শ ৭. বেদনা ৮. তৃষ্ণা ৯. উপাদান ১০. ভব ১১. জন্ম ও ১২. জরা-মরণ । এই দ্বাদশ অঙ্গের সর্বপ্রথমে রয়েছে অবিদ্যা। এই অবিদ্যাই পুনর্জন্ম প্রদানকারী তৃষ্ণার জনক । এই অবিদ্যাই দুঃখের অতীত হেতু এবং তৃষ্ণা বর্তমান হেতু ।
১. অবিদ্যাঃ অবিদ্যা মানে বিদ্যার অভাব । বিদ্যা অর্থ সম্যক জ্ঞান বা প্রজ্ঞা। অবিদ্যা চিত্তের এমন এক অবস্থা, যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কোন বিষয় বা বস্তুর যথার্থ স্বভাব জানতে দেয় না এবং বিপরীত বোধের সৃষ্টি করে। এ অজ্ঞানতাই অবিদ্যা। যেমন-চার আর্যসত্য সম্বন্ধে অজ্ঞানতাই অবিদ্যা । রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান অর্থাৎ পঞ্চ উপাদান স্বন্ধ যে দুঃখময়, তা না জানা অবিদ্যা । জীবন দুঃখের কারণ তৃষ্ণা, তৃষ্ণার নিরোধে (ধ্বংস) দুঃখের নিরোধ, এসব না জানা অবিদ্যা । আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গানুযায়ী জীবনযাপন যে তৃষ্ণা নিরোধের একমাত্র উপায়, এটা না বুঝা অবিদ্যা। এ অবিদ্যা আমাদের চিত্তে কিরূপে উৎপন্ন হয়? সৎকায় দৃষ্টি বা আত্মদৃষ্টি (সব কিছু আমার, আমার) কিংবা ভ্রান্ত ধারণাই হল এই অবিদ্যা । অবিদ্যার অপর বা অন্য নাম মোহ। এই মোহ মানব চিত্তের একটি মহা শক্তিশালী অকুশল চিত্তবৃত্তি বা চৈতসিক। সেরূপ লোভ, দ্বেষও শক্তিশালী অকুশল চৈতসিক। এই অবিদ্যা আমাদের চিত্তে লোভ, দ্বেষ, মোহ কিংবা অলোভ, অদ্বেষ ও অমোহের আকারে উৎপন্ন হয় এবং আমরা তদনুযায়ী চিন্তা করি, কথা বলি বা কাজ করি। এতে আমাদের কুশলাকুশল চিত্ত উৎপন্ন হয়। এরূপে সংস্কার উৎপত্তির প্রধান কারণ এই অবিদ্যা।
২. অবিদ্যার প্রত্যয়ে (কারণে) সংস্কারঃ অবিদ্যার কারণে সংঙ্কারের উৎপত্তি হয়। সংস্কার মানে কর্ম । এ কর্ম কায়-বাক্য-মন এ ত্রিদ্ধারে সংগঠিত হয় । অবিদ্যাচ্ছন্ন জীবনে যখন কেহ কোন বিষয় চিন্তা করে, বাক্য বলে কিংবা কোন কাজ করে, তখন সেই চিন্তা, বাক্য ও কাজ চিত্তে এক নতুন ভাবের সৃষ্টি করে। চিত্তের এই নতুন ভাব বা চেতনাই সংস্কার । এ হিসেবে সংস্কার তিন প্রকার । যথা-কায়-সংস্কার, বাক-সংক্কার ও চিত্ত-সংস্কার ৷ এ সংস্কার হল পুনর্জন্ম প্রদানকারী চেতনা, তা কুশলও হতে পারে, অকুশলও হতে পারে। বুদ্ধ বলেছেন, “হে ভিক্ষুগণ, চেতনাকেই আমি কর্ম বলি।“ কুশল-অকুশল এ চেতনাই কর্ম সৃষ্টি করে এবং এ কর্মই পুনর্জন্ম ঘটায় । কুশলাকুশল ভেদে এ সংস্কার ত্রিবিধ । যথা-কুশল সংস্কার, অকুশল সংস্কার ও আনেঞ্জা সংস্কার ৷ যদি কেহ অবিদ্যাকে অকুশল ও বর্জনীয় বলে এর প্রভাব থেকে মুক্ত হতে চেষ্টা করে অথবা অবিদ্যাকে ক্ষয় করার অভিপ্রায়ে দানাদি পুণ্যকর্ম সম্পাদন করে, তখন তার কুশল কর্ম বা কুশল সংস্কার উৎপন্ন হয় । এই কুশল সংঙ্কার হচ্ছে আট প্রকার কামাবচর কুশল চিত্তের, পাচ প্রকার রুপাবচর কুশল চিত্তের এবং চার প্রকার অরূপাবচর কুশল চিত্তের সংস্কার । অবিদ্যাচ্ছন্ন চিত্তে যদি কেহ লোভ-দ্বেষ-মোহমূলক কর্ম, যেমন হত্যা, চুরি, ব্যভিচার ইত্যাদি অকুশল কর্ম করে, তদ্বারা তার অকুশল সংঙ্কার উৎপন্ন হয় । দ্বাদশ প্রকার অকুশল চিত্তের কর্মই অকুশল সংস্কাররূপে পরিচিত । যে কর্ম কুশলও নয়, অকুশলও নয়, সেসব কর্মকে বলা হয় আনেঞ্জা বা অব্যাকৃত সংস্কার । মূলতঃ লোত, দ্বেষ, মোহ প্রভৃতি পঞ্চাশ প্রকার সৎ ও অসৎ মনোবৃত্তিকে সংস্কার বলা হয় । অতীতে যে সকল কাজ করা হয়েছে এবং অনাগতেও যে সকল কর্ম করা হবে, সে সব কর্মের সমষ্টিকে “সংস্কার এবং বর্তমান কর্ম প্রবাহকে “কর্ম” নামে অভিহিত করা হয়। বুদ্ধ ও অর্হত্বের কার্যাবলী সংস্কারের মধ্যে গণ্য নয়, কেননা তাদের কর্ম অবিদ্যামুক্ত ও প্রজ্ঞাদীপ্ত।
৩. সংস্কারের প্রত্যয়ে বিজ্ঞানঃ সংঙ্কারের কারণে বিজ্ঞানের উৎপত্তি হয়। বিজ্ঞান হচ্ছে মন বা চিত্ত। এ স্থলে বিশেষতঃ উনবিংশ (১৯) প্রকার প্রতিসন্ধি বিজ্ঞান বা চিত্তকে বিজ্ঞান নামে অভিহিত করা হয় । কামাবচর অহেতুক উপেক্ষা সহগত দুই (কুশলাকুশল) সন্তীরণ চিত্ত, কামাবচর অষ্ট মহাবিপাক চিত্ত, পাচ প্রকার রূপাবচর কুশল বিপাক চিত্ত এবং চার প্রকার অরূপ কুশল বিপাক চিত্ত একত্রে উনবিংশ প্রকার প্রতিসন্ধি বিজ্ঞান বা চিত্ত । মূলতঃ বিপাক চিত্ত বত্রিশটি । সবটাই এ পর্যায়ভুক্ত । কুশল-অকুশল সংস্কারের প্রত্যয়ে প্রতিসন্ধি ও প্রবর্তন উভয়কালে এই বিপাক চিত্ত উৎপন্ন হয় । প্রতিসন্ধি ও চ্যুতির মধ্যবর্তী সময়কে প্রবর্তন কাল বলা হয় । এটা চিত্তের সংস্কারজাত শক্তির ফলাবস্থা বা বিপাক বিজ্ঞান । অকুশল সংস্কারের প্রত্যয়ে প্রতিসন্ধির সময় অকুশল ফল লাভ হয় এবং অকুশল উপেক্ষা সন্তীরণ বিজ্ঞান উৎপন্ন হয়। প্রবর্তনের সময় সপ্তবিধ অহেতুক বিপাক বিজ্ঞান উৎপন্ন হয় । কুশল সংস্কারের প্রত্যয়ে কামজগতে প্রতিসন্ধির সময় কুশল ফল লাভ হয় এবং কুশল উপেক্ষা সন্তীরণ ও আট প্রকার মহাবিপাক মোট নয় প্রকার বিপাক বিজ্ঞান উৎপন্ন হয়। প্রবর্তনের সময় আট প্রকার মহাবিপাক ও আট প্রকার অহেতুক বিপাক মোট ১৬ প্রকার বিপাক বিজ্ঞান উৎপন্ন হয়। রূপভবে রূপকুশল সংস্কারের প্রত্যয়ে প্রতিসন্ধি ও প্রবর্তন উভয়কালে পাচ প্রকার রূপাবচর বিপাক বিজ্ঞান উৎপন্ন হয় । অরূপ ভবে অরূপ কুশল সংস্কারের প্রত্যয়ে প্রতিসন্ধি ও প্রবর্তন উভয়কালে চার প্রকার অরূপ বিপাক বিজ্ঞান উৎপন্ন হয়। প্রতিসন্ধি বিজ্ঞান বা প্রতিসন্ধি চিত্ত বশেই ভব হতে ভবান্তরে জন্ম হয়ে থাকে।
৪. বিজ্ঞানের প্রত্যয়ে নামরূপঃ বিজ্ঞানের কারণে নামরূপের উৎপত্তি হয়। পঞ্চস্কন্ধের অন্য নাম নামরূপ । ‘রুপ’ বলতে রূপক্কন্ধকে বুঝায় । অন্য ক্কন্ধসমূহকে একত্রে ‘নাম’ বলা হয়। এই নামরপ প্রতিসন্ধি ও প্রবর্তন ভেদে দ্বিবিধ। উল্লিখিত কামাবচর দুই প্রকার উপেক্ষা সহগত সন্তীরণ চিত্ত, কামাবচর আট প্রকার মহাবিপাক চিত্ত এবং নয় প্রকার মহদ্গত বা রূপারূপ বিপাক চিত্ত (রূপাবচর বিপাক চিত্ত ৫ এবং অরূপাবচর বিপাক চিত্ত ৪) মোট উনিশ প্রকার চিত্তের দ্বারা প্রতিসন্ধি ঘটে থাকে অর্থাৎ নামরূপের উৎপত্তি হয়। কামাবচর উপেক্ষা সহগত অকুশল সন্তীরণ চিত্ত কামদুর্গতি (তির্যক, প্রেত, অসুর ও নিরয়) ভূমিতে প্রতিসন্ধি ঘটায়। কামাবচর উপেক্ষা সহগত কুশল সন্তীরণ চিত্ত মনুষ্যকুলে প্রতিসন্ধি ঘটায়, কিন্তু জন্মান্ধ, বধির, বিকলাঙ্গ, বিকৃত মস্তিষ্ক, ক্লীব বা হাবা-গোবা হয়ে সত্ত্ব জন্মধারণ করে । কামাবচর অষ্ট মহাবিপাক চিত্ত সপ্তবিধ কাম সুগতি ভূমিতে (মনুষ্যলোকে ও ছয় দেবলোকে) প্রতিসন্ধি ঘটায় । পাচ প্রকার রূপাবচর কুশল বিপাক চিত্ত ১৬টি রূপ ব্রহ্মভূমিতে প্রতিসন্ধি ঘটায় । এসব ব্রক্ষ্মভূমি রূপ ধ্যানের দ্বারা লাভ করতে হয়। চার প্রকার অরূপ কুশল বিপাক চিত্ত চার অরূপ ব্রক্ষ্মভূমিতে প্রতিসন্ধি ঘটায় তাও অরূপ ধ্যানলভ্য ৷ সেজন্যে বলা হয়-“বিজ্ঞান” নামরূপ উৎপত্তির প্রত্যয় বা হেতু ।
৫. নামরূপের প্রত্যয়ে ষড়ায়তনঃ নামরূপের কারণে ষড়ায়তনের উৎপত্তি হয় । আয়তন অর্থ বসতি স্থান। চক্ষুবিজ্ঞানের বসতি স্থান হচ্ছে চক্ষু । সেজন্যে চক্ষু আয়তন। সেরূপ শ্রোত্রবিজ্ঞানের বসতি স্থান হচ্ছে শ্রোত্র বা কর্ণ। তাই শ্রোত্রও আয়তন । তদ্রুপ ঘ্রাণ আয়তন,জিহবা আয়তন, কায় আয়তন ও মন আয়তন । এ ছয়টিই হচ্ছে ষড়ায়তন । নামরূপের উৎপত্তির কারণে এ ষড়ায়তনের অস্তিত্ব ।
৬. ষড়ায়তনের প্রত্যয়ে স্পর্শঃ ষড়ায়তনের কারণে স্পর্শ উৎপন্ন হয় । চক্ষু, শ্রোত্র, ঘ্রাণ, জিহ্বা, কায় ও মন – এ ষড়ায়তনের সাথে যথাক্রমে রূপ, শব্দ, গন্ধ, রস, স্পৃষ্ট ও ভাব-এ সব বহিরয়াতনের সম্মিলন ঘটলে বিজ্ঞানের উৎপত্তি হয় । তখন চক্ষু, রূপ ও চক্ষুবিজ্ঞানের মিলনে যে স্পর্শের উৎপত্তি হয়, তা চক্ষু সংস্পর্শ। সেরূপ শ্রোত্র-সংস্পর্শ, ঘ্রাণ সংস্পর্শ, জিহবা সংস্পর্শ, কায় সংস্পর্শ ও মন সংস্পর্শ ।
৭. স্পর্শের প্রত্যয়ে বেদনাঃ স্পর্শের কারণে বেদনার উৎপত্তি হয় । বেদনা মানে অনুভূতি । এটি ত্রিবিধ বেদনা বলতে সুখ, দুঃখ ও উপেক্ষা বেদনা বা অনুভূতিকে বুঝায় । দ্বার ভেদে বেদনা বা অনুভূতি ছয় প্রকার । যথা-চক্ষু সংস্পর্শ দ্বারা যা অনুভূত হয়, তা চক্ষু সংস্পর্শজ বেদনা । সেরুপ শ্রোত্র সংস্পর্শজ বেদনা, ঘ্রাণ-সংস্পর্শজ বেদনা, জিহ্বা সংস্পর্শজ বেদনা, কায় সংস্পর্শজ বেদনা এবং মন সংস্পর্শজ বেদনা ।
৮. বেদনার প্রত্যয়ে তৃষ্ণাঃ বেদনার কারণে তৃষ্ণার উৎপত্তি হয়। চক্ষু সংস্পর্শজ বেদনা থেকে রূপ তৃষ্ণা, শ্রোত্র সংস্পর্শজ বেদনা থেকে শব্দ তৃষ্ণা, ঘ্রাণ সংস্পর্শজ বেদনা থেকে গন্ধ তৃষ্ণা, জিহ্বা সংস্পর্শজ বেদনা থেকে রস তৃষ্ণা, কায় সংস্পর্শজ বেদনা থেকে স্পর্শ তৃষ্ণা এবং মন সংস্পর্শজ বেদনা থেকে ভাব তৃষ্ণা উৎপন্ন হয়। মূলতঃ তৃষ্ণা তিন প্রকার-কামতৃষ্ণা, ভব তৃষ্ণা ও বিভব তৃষ্ণা । রূপ-শব্দ-গন্ধ-রস ইত্যাদি ছয় বিষয় বা আলম্বনের যে কোনটি উপভোগের যে তৃষ্ণা, তা কামতৃষ্ণা। কামতৃষ্ণা যখন শাশ্বত দৃষ্টির সাথে প্রবর্তিত হয়ে কামভব, রূপভব ও অরূপভবে জন্যগ্রহণের তৃষ্ণা উৎপন্ন হয়, তখন এটা ভব তৃষ্ণা। আর এ কামতৃষ্ণা যখন উচ্ছেদ দৃষ্টি অর্থাৎ মৃত্যুর সাথে সাথে অস্তিত্বের বিলুপ্তি-এ বিশ্বাসের সাথে প্রবর্তিত হয়, তখন তাকে বিভব তৃষ্ণা বলা হয়। সমস্ত সত্ত্ব এ তিন তৃষ্ণাজালে আবদ্ধ ।
৯. তৃষ্ণার প্রত্যয়ে উপাদানঃ তৃষ্ণার কারণে উপাদানের উৎপত্তি হয় । উপাদান অর্থে বুঝায় তৃষ্ণার বস্তুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ । তৃষ্ণা যখন গাঢ় হয়, অর্থাৎ চিত্তে দৃঢ়মূল হয় এবং তা থেকে অব্যাহতির কোন উপায় থাকে না, তখন তা উপাদানে পরিণত হয় এবং তা অতি সুক্ষরূপে চিত্তে স্থিত থাকে । উপাদান চার প্রকার-কাম উপাদান, দৃষ্টি উপাদান, শীলব্রত পরামর্শ উপাদান ও আত্মবাদ উপাদান । ক. কাম উপাদানঃ ষড়েন্দ্রিয় গ্রাহ্যবস্তুতে যে সুখ উৎপন্ন হয়, তাকে দৃঢ়ভাবে গ্রহণ ও ধারণ । খ. দৃষ্টি উপাদান ঃ তৃষ্ণার বিষয়কে নিত্য সুখ ও শুভ মনে করে দৃঢ়রূপে ধারণ । গ. শীল্ব্রত পরামর্শ উপাদানঃ তৃষ্ণার বস্তুকে অনিত্য মনে করে তার স্থায়িত্বের জন্যে ব্রত, মানত, পূজাদির দ্বারা দৃট়ীকরণ এবং এ সবে পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন । ঘ. আত্মবাদ উপাদানঃ আত্মা, লোক বা পঞ্চস্বন্ধ শাশ্বত বলে ধারণা এবং তাতে পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন । এ পঞ্চঙ্কন্ধকে “আমি আমার” ইত্যাদি রূপে বিশ্বাস আত্মবাদ উপাদানের অন্তর্গত। মৎস্য যেমন আমীষ লোভে বড়শীতে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, সেরূপ তৃষিত ব্যক্তি এ চার উপাদানে নিয়ত আবদ্ধ হয়। বিষয়ের প্রতি আসক্তিই হল উপাদান।
১০. উপাদানের প্রত্যয়ে ভবঃ উপাদানের কারণে ভবের উৎপত্তি হয়, ভূ-ধাতু থেকে ভব অর্থ উৎপন্ন হওয়া। এটা দ্বিবিধ–কর্মভব ও উৎপত্তি ভব । মানুষের কৃত কর্মই কর্মভব এবং কর্ম দ্বারা উৎপন্ন স্কন্ধই উৎপত্তি ভব । উপাদানই বর্তমান কর্মভব এবং পরজন্মে উৎপত্তি ভবের কারণ হয়। উনত্রিশ (২৯) প্রকার (১২ অকুশল, ৮ কুশল ও ৯ রুপারূপ চিত্ত) লৌকিক কুশল-অকুশল চিত্ত কর্ম, চেতনা, সংস্কার ইত্যাদি কর্মভব, যা জীবনের সক্রিয় অংশ; যেমন-অবিদ্যা, সংস্কার, তৃষ্ণা, উপাদান ও ভব । বত্রিশ প্রকার লৌকিক বিপাক চিত্ত (৭ অহেতুক বিপাক, ৮ মহা বিপাক, ৮ অহেতুক কুশল বিপাক ও ৯ রূপারূপ বিপাক বিজ্ঞান বা চিত্ত) হচ্ছে উৎপত্তি ভব, যা জীবনের প্রতিক্রিয়াশীল অংশ, যেমন-বিজ্ঞান, নামরূপ, ষড়ায়তন, স্পর্শ ও বেদনা । এ উৎপত্তি ভব নয় প্রকার, যথা-কামভব, রূপভব, অরূপভব, সংজ্ঞাভব, অসংজ্ঞাভব, নেব-সংজ্ঞা-না-সংজ্ঞা ভব, এক স্বন্ধ ভব, চার স্কন্ধ ভব ও পঞ্চস্কন্ধ ভব । পূর্ববর্তী জন্ম থেকে পরবর্তী জন্মের কর্মফল রূপে সংযোগ ঘটায় এ কর্মভব ও উৎপত্তি ভব। অতীত জন্মের পাচ প্রকার হেতু বর্তমান জন্মে পাচ প্রকার ফল প্রসব করে থাকে ।আবার বর্তমান জন্মের পাঁচ প্রকার হেতু ভবিষ্যৎ জন্মে পাচ প্রকার ফল প্রসব করে । তাই বলা হয়েছে-
অতীত জন্মের পাচ প্রকার হেতুঃ অবিদ্যা, সংস্কার, তৃষ্ণা, উপাদান ও ভব।
বর্তমানের পঞ্চফলঃ বিজ্ঞান, নামরূপ, ষড়ায়তন, স্পর্শ ও বেদনা ।
বর্তমান জন্মের পাচ প্রকার হেতুঃ অবিদ্যা, সংস্কার, তৃষ্ণা, উপাদান ও ভব।
ভবিষ্যতের পঞ্চফল ঃ বিজ্ঞান, নামরূপ, ষড়ায়তন, স্পর্শ ও বেদনা ।
১১. ভবের প্রত্যয়ে জাতি বা জন্মঃ ভবের কারণে জাতি বা জন্ম হয়। জন্ম অর্থে মাতৃ-জঠরে প্রতিসন্ধি গ্রহণকে বুঝায় । প্রতিসন্ধিক্ষণে রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান-এ পঞ্চস্কন্ধের মাতৃগর্ভে উৎপত্তি হয় । কর্মভবই প্রতিসন্ধি বা পুনর্জন্মের কারণ বা প্রত্যয় । মনুষ্য ও তির্যক জন্মে সত্ত্বগণ মাতৃজঠরে প্রতিসন্ধি গ্রহণ করে। কিন্তু দেব-ব্রহ্মলোকে বা অপায়ে সত্ত্বগণ স্বয়ং উৎপন্ন হয় । মানুষের ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র, তাদের ভিন্ন ভিন্ন সুখ-দুঃখ প্রাপ্তি থেকে সহজেই বুঝা যায়, তা পূর্বজন্মের বিভিন্ন কর্ম বা কর্মভবের ফল। মানুষ এভাবে চার অপায়ে, এক মনুষ্যলোকে, ছয় দেবলোকে, ষোড়শ রূপ ব্রহ্মলোকে এবং চার অরূপ ব্রহ্মলোকে সুখ-দুঃখের মধ্য দিয়ে আবর্তিত ও বিবর্তিত হচ্ছে। নদীর স্রোতের ন্যায় এ গতি অবিরাম চলছে। জ্ঞানীগণ এ প্রবাহকে দুঃখপ্রদ মনে করে তা রোধ করেন। এ প্রবাহ কার্ষ-কারণ নির্ভর। তাই এটি দুঃখময়, অনিত্য ও অনাত্ম। তাই বলা হয়-যেরূপ বীজ বপন করা হয়, সেরূপ ফলই ফলিত হয়।
১২. জাতি বা জন্মের প্রত্যয়ে জরা, মরণ, শোক,, পরিদেবন (বিলাপ), দুঃখ, দৌর্মনস্য, উপায়াস (হতাশা) ইত্যাদির উৎপত্তি হয়। জন্ম হলেই জরা (বার্ধক্য) ও মৃত্যুর সম্মুখীন হতে হয় এবং এদের আনুষঙ্গিক শোক, বিলাপ, শারীরিক ও মানসিক দুঃখ, নৈরাশ্য ইত্যাদি নানারকম দুঃখ ভোগ করতে হয় । এরূপে অবিদ্যার কারণে নানাবিধ দুঃখকষ্ট উৎপন্ন হয়ে থাকে । অবিদ্যাকে বিদ্যা বা প্রজ্ঞার দ্বারা সম্পূর্ণ নিরুদ্ধ করতে পারলে সংস্কারাদি দ্বাদশ অঙ্গের পূর্ণ পরিসমাপ্তি সম্ভব। অবিদ্যার নিরোধে (ধ্বংসে) সংস্কার নিরোধ হয়, সংস্কারের নিরোধে বিজ্ঞান নিরোধ হয়, বিজ্ঞানের নিরোধে নামরূপের নিরোধ, নামরূপের নিরোধে ষড়ায়তনের নিরোধ, ষড়ায়তনের নিরোধে স্পর্শের নিরোধ, স্পর্শের নিরোধে বেদনার নিরোধ, বেদনার নিরোধে তৃষ্ণার নিরোধ, তৃষ্ণার নিরোধে উপাদানের নিরোধ, উপাদানের নিরোধে ভবের নিরোধ, ভবের নিরোধে জাতি বা জন্মের নিরোধ, জন্মের নিরোধে জরা, মরণ, শোক, পরিদেবন, দুঃখ, দৌর্মনস্য ও উপায়াস নিরুদ্ধ হয় । এরূপে সমস্ত দুঃখরাশি নিঃশেষে নিরুদ্ধ হয় । তখন পুনর্জন্ম নিরুদ্ধ হয় এবং সাথ সাথে দুঃখের হয় আত্যন্তিক নিবৃত্তি।
কেশ, কর্ম ও বিপাক এ ত্রিবিধ বৃত্ত বা আবর্তের নিরন্তর আবর্তন-বিবর্তনে জড়িত হয়ে সত্ত্বগণ অহরহ অবিদ্যা ও তৃষ্ণামূলক নানাবিধ আসবের সৃষ্টি করছে। যার ফলে জন্ম-মৃত্যু পরম্পরায় নিপীড়িত হয়ে জন্ম-জন্মান্তরে অনন্ত দুঃখ-যন্ত্রণা ভোগ করছে । ভগবান বুদ্ধ সত্ত্বগণে এই ভীষণ দুঃখে ব্যথিত হয়ে তাদেরকে ক্লেশ-কর্ম-বিপাকাবর্ত হতে মুক্ত করবার উদ্দেশ্যে এই প্রতীত্য সমুৎপাদ বা কার্য-কারণ নীতি দেশনা করেন । অবিদ্যা ও তৃষ্ণা কার্য-কারণ নীতির এই দু’টো মূল ছিন্ন করতে পারলেই জীবগণ ভবদুঃখ হতে মুক্ত হতে পারে । এতে লীলাময়ের লীলা, ইচ্ছাময়ের ইচ্ছা কিংবা দৈব খেয়ালের কোনরূপ দোহাই নেই । এ নীতি তথাগত বুদ্ধের এক অপূর্ব অবদান । এ নীতিই বৌদ্ধধর্মকে অন্য ধর্ম থেকে পৃথক করে রেখেছে । এ নীতিতে যারা সামান্যতম জ্ঞান লাভ করেছেন, তারাই অকুণ্ঠ চিত্তে স্বীকার করেছেন বৌদ্ধধর্মের মাহাত্ম্য । আর যারা এ মর্মে সাধনালন্ধ পারমার্থিক জ্ঞান লাভ করেছেন, তাদের কথা আর কি বলবো!

সম্মন্ধে SNEHASHIS Priya Barua

এটা ও দেখতে পারেন

মেডিটেশান এবং আপনার ব্রেইন

Leave a Reply