ব্রেকিং নিউজ

সদ্ধর্মের আলোকরশ্মি ভদন্ত শীলানন্দ স্থবির (ধুতাঙ্গ ভান্তে) এর ৪০তম জন্মজয়ন্তীতে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলী

ইলা মুৎসুদ্দী

shilananda

ঘন শ্রাবণের মেঘের মতো রসের ভারে নম্রনত,

একটি নমষ্কারে প্রভু, একটি নমষ্কারে

সমস্ত মন পড়িয়া থাক তব ভবন দ্বারে।

যুগে যুগে অনেক ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটে পৃথিবীতে। তাঁদের জ্ঞানপ্রতিভায়, প্রজ্ঞায় ও আদর্শে পূর্ণতা পায় সমাজ-সভ্যতা সর্বোপরি মানবতা। তাঁদের আজন্মলালিত স্বপ্ন মানবতার বাণী প্রচারের মাধ্যমে মানুষের মধ্য ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির উন্মেষ ঘটানো।

যে ব্যক্তি পরিপূর্ণরূপে তাঁর (ধর্ম পালনের) প্রতিশ্রুতি নেন,

তিনি সহজে লক্ষ্যে পৌঁছেন এবং (তাঁর) সুফল লাভ করেন,

ভালভাবে জেনে ধর্মের অনুশীলন করলে,

তদনুসারে তিনি তাঁর লক্ষ্যে পৌঁছবেনই। —– আত্মবর্গ

সমকালীন চিন্তাজগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, জ্ঞানতাপস শীলানন্দ ভিক্ষু (ধুতাঙ্গ ভান্তে) অনুপম গুণবৈশিষ্ট্য, অতুলনীয় কীর্তিমাহাত্ম্য ও অনন্যসাধারণ জীবনের অধিকারী। জ্ঞানরাজ্যের ভুবনে তাঁর প্রজ্ঞাদীপ্ত বিচরণ। জগৎ ও জীবনের স্বরূপ উপলব্ধির মাধ্যমে আধুনিক মননসমৃদ্ধ প্রাগ্রসর এই সত্যানুসন্ধানী গভীর অর্ন্তজ্ঞান দ্বারা আলোকশিখা প্রজ্জ্বলিত করতে সর্বদা সচেষ্ট। জ্ঞানান্বেষণ-সাধনার নিরন্তর ব্রতচারী হয়ে জগৎ ও জীবনের প্রকৃত সারসত্য উন্মোচনে প্রয়াসী। তাঁর আধুনিক-প্রাগ্রসর আলোকিত দর্শনসত্ত্বা সমাজ-দেশ-জাতিকে উদ্ভাসিত করেছে। তাঁর দর্শনমানসের বিকীর্ণ জ্যোতির্ময় প্রভা আমাদের মহিমান্বিত করছে সর্বদা। তিনি চেতনায় যা ধারণ করেছেন, তা কর্মে প্রতিফলিত করেছেন। কর্মই ছিল তাঁর একান্ত সাধনা। সত্যিকার অর্থেই তিনি একজন মহান কর্মযোগী। কর্মের মাধ্যমেই দেশ-জাতির কল্যাণ সাধনের চেষ্টা করে চলেছেন অবিরাম। বুদ্ধের নীতি আদর্শের অনুসারী হিসেবে বৌদ্ধ ধর্ম দর্শনের গভীর প্রভাব তাঁর উপর পড়েছিল — যার কারণে এত অল্প বয়সে উনি অর্জন করতে পেরেছেন প্রজ্ঞার দর্শন। বৌদ্ধিক ধ্যান- ধারণায় ঋদ্ধ হয়েছে তাঁর চিন্তা-চেতনা। আজীবন বুদ্ধের নীতি-আদর্শ তথা বৌদ্ধ ধর্ম দর্শনের বিশ্বজনীন আবেদনকে চর্চা ও প্রচারের মাধ্যমে মানবতার জয়গান তথা অসচেতন মানবগোষ্ঠীকে সচেতন, ধর্মপরায়ন করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। বৌদ্ধ ধর্ম দর্শন শুধু বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে নিবেদিত। বুদ্ধের অহিংসানীতি, মৈত্রী-করুণা-মুদিতা-উপেক্ষা নীতি বা ব্রক্ষ্মবিহারতত্ত্ব, উদার মানবতাবাদ, সার্বজনীন সাম্যবাদ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রভৃতি উপাদানের এক অপূর্ব সমন্বয় পূজনীয় শীলানন্দ ভিক্ষুর জীবন দর্শন। বৌদ্ধ দর্শনের প্রতীত্যসমুৎপাদ নীতি, অনিত্যবাদ, শূণ্যবাদ, কর্মবাদ, দুঃখবাদ, চতুরার্য্যসত্য, আর্যঅষ্টাঙ্গিকমার্গ প্রভৃতি মৌলিক বিষয়ের সুষমামন্ডিত সমাবেশ তাঁর দর্শনমানসের বুনিয়াদ সৃষ্ঠি করেছে। তাঁর চিন্তা ও কর্মে বৌদ্ধ দর্শনের ধর্মীয়, নৈতিক, সামাজিক, সাং®কৃতিক, অর্থনৈতিক সর্বোপরি মানবিক মূল্যবোধ স্থান পেয়েছে। তাঁর দর্শনমানস অবশ্যই বিরলতায় বিশিষ্ট, স্বতন্ত্র এবং ব্যতিক্রমী। মহান বুদ্ধের একজন সুযোগ্য উত্তরাধিকাররূপে পূজনীয় ধুতাঙ্গ ভান্তে সদ্ধর্মের আলোকরশ্মি হয়ে বিচরণ করছেন মানবসমাজে। মানবতাবাদের ব্রতচারী তিনি।

পুণ্যের বিপাক সুখকর,

যদ্বারা সমস্ত আশা-আকাঙ্খা পরিপূর্ণ হয়।

পুণ্যবান দ্রুতই প্রশান্তির দিকে অগ্রসর হন

এবং স্বকীয় প্রচেষ্টায় নির্বাণ পৌঁছেন।—দন্ডবর্গ

মহাকারুণিক তথাগত বুদ্ধ মানবকল্যাণে তাঁর ধর্মবাণী প্রচার করেছিলেন। তাঁর প্রথম ধর্মপ্রচারের নির্দেশনা ছিল — ”ভিক্ষুগণ, নিজের সুখ ও হিতের জন্য, বহুজনের সুখ ও হিতের জন্য, দেব-মানবের হিত ও কল্যাণের জন্য আমাকর্তৃক দেশিত আদি-মধ্য-অন্ত কল্যাণকর ধর্ম চারিদিকে প্রচার কর।” বুদ্ধের এই প্রথম নির্দেশনায় নিজের ও অপরের কল্যাণ সাধনের উপদেশ রয়েছে। যাঁরা বুদ্ধের এ নির্দেশনায় উদ্বুদ্ধ  হয়ে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেছেন তাঁরা নিজের জীবনকে সার্থক করেছেন, অপরের জীবনকেও মহিমান্বিত করার চেষ্টায় রত আছেন। পূজনীয় ধুতাঙ্গ ভান্তে এমনিতর এক মহাজীবনের অধিকারী যিনি মহামতি বুদ্ধের উপদেশের আলোকে নিজের জীবনকে সার্থক ও ধন্য করেছেন এবং পরহিত সাধন করে অনেকের জীবনকে পরিশীলিত ও কল্যাণময় করতে সহায়তা করছেন নিরন্তর। আত্মহিতে পরিশীলিত জীবনচর্চার পাশাপাশি যে পরহিতে লব্ধ জ্ঞান প্রচারে রত আছেন তার দৃষ্টান্ত সত্যিই বিরল। সম্প্রদায়ের প্রতি ও জাতির প্রতি তাঁর মমত্ববোধ-প্রেম-ভালোবাসা তাঁকে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান (বুদ্ধের নীতি অনুসারে) গড়তে উদ্বুদ্ধ করেছে।

মানুষ মানুষের জন্য —এ নীতিবাক্য তাঁর জীবনে পরিপূর্ণভাবে প্রতিফলিত। তিনি নিজের কল্যাণে যেমন ব্রতী তেমনি পরের মঙ্গল সাধনেও নিবেদিতপ্রাণ। আত্ম-পরহিত সাধনে তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তিনি একাধারে আত্মমুক্তি সাধনায় আত্মনিবেদিত মহান সাধক, ব্রতচারী, শীলবান, বিনয়ী, প্রজ্ঞাবান অপরদিকে পরার্থে নিবেদিতপ্রাণ আদর্শ গুরু ও শিক্ষক। এছাড়াও তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের একান্ত শ্রদ্ধাভাজন মহান সংঘকুল গৌরব। ধ্যানশিক্ষা ও জ্ঞানশিক্ষা দুটোই দীক্ষাগুরুর আশ্রমের প্রধান শিক্ষা। ত্যাগ ও সংযম জীবনযাপনই শ্রেষ্ঠ শিক্ষা। সে শিক্ষার সঙ্গে নৈতিক শিক্ষা এবং সেবা শিক্ষার উপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। যাতে আদর্শ ব্রক্ষ্মচারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। গুরু শব্দটির মধ্যে রয়েছে তার ব্যাপক অর্থ। ’গু’ শব্দের অর্থ ’অন্ধকার’ আর ’রু’ শব্দের অর্থ আলো। মানবজীবনের সকল অন্ধকার দূর করে যিনি জীবনকে আলোয় আলোয় ভরিয়ে দিতে পারেন তিনিই গুরু। গুণগত মান অনুসারে গুরুর মান মর্যাদা অতি উচ্চে। পূজার দিক থেকে অতিপূজ্য। তিনিই প্রকৃত গুরু যাঁর দুঃখে উদ্বেগশুন্য, সুখে ষ্পৃহাশূণ্য, যাঁর মধ্যে নেই কোন আসক্তিভয় এবং ক্রোধ তিনিই স্থিত প্রাজ্ঞ। অর্থাৎ তিনিই যথার্থ গুরু। তাঁকেই বলা হয় সৎগুরু, সৎসঙ্গ । সৎনাম মানুষকে আত্মমুক্তির পরিচয় দেয়। গুরু জ্ঞানচক্ষু উন্মোচিত করেন। তিনি সৎ এর বার্তাবাহী। অবিদ্যার পথে যারা বিচরণ করে তারা অন্ধকারের পথে বিচরণ করে। আর যারা জ্ঞানের পথে তথা আত্মদর্শনের, মহাজ্ঞানের পথে অর্থাৎ মহাজ্যোতিদর্শনের ক্রিয়াযোগে বিচরণ করে তারা ভয়ংকর গভীরতর অন্ধকারে বিচরণ করেও তেমন ভয় পায় না। গুরু চঞ্চল মনকে ও অন্ধকারের যবনিকাকে ছিন্ন করে পরপারের জ্যোতিকে দর্শন করে নিজের মধ্যে তাঁকে দর্শন করার কৌশল শেখায়। যাকে আমি দেখিনা, বুঝিনা আমার গুরু তাকে দেখিয়ে দেন। তা দেখলে সব বুঝা হয়ে যায়। সব অন্ধকারের পাঁচিল পার হওয়া যায়।

বুদ্ধের প্রতিষ্ঠিত সংঘসদস্যদেরকে গুরু নামে অভিহিত করা হয়েছে। সংঘগুরুদের নয়টি মহান গুণের বিষয় ঃ ১) সুপ্রতিপন্ন অর্থাৎ সুন্দর ও কল্যাণকর পথে বিচরণ করা, ২) উজু (ঋজু) পথ প্রতিপন্ন অর্থাৎ উজুমার্গ প্রতিপন্ন, ৩) ন্যায় প্রতিপন্ন, ৪) উত্তম প্রতিপদায় প্রতিপন্ন, ৫) আহবানের যোগ্য অর্থাৎ গুণীর গুণ মূল্যায়নের যোগ্য, ৬) প্রাপ্তিযোগ, পূজা ও ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য, ৭) দক্ষিণা অর্থাৎ গুরুদক্ষিণা পাওয়ার যোগ্য, ৮) নমষ্কার ও শ্রদ্ধা পাওয়ার যোগ্য এবং ৯) সেই আদর্শে উদ্দীপ্ত সংঘগুরু মাত্র শ্রেষ্ঠ পুণ্যক্ষেত্র অর্থাৎ মার্গফল লাভী সংঘ পুণ্যক্ষেত্র নামে অভিহিত। নয়গুণ সম্পন্ন সংঘকে বলা হয় আর্যসংঘ। ”আর্য” শব্দের অর্থ উত্তম বা শ্রেষ্ঠ যা গুণগত দিক থেকে উচ্চমার্গের অধিকারীদের বলা হয়েছে। তাঁরাই বহুজনের হিত-সুখ তথা জীবন দর্শনের বাণী আয়ত্ব করে প্রচারে রত থাকেন। তাঁরাই শ্রেষ্ঠ সংঘ নামে অভিহিত।

প্রজ্ঞা লাভের পক্ষে যত পদ্ধতি, যত সাধনা, যত পারমিতা, যত বিদ্যা, যত আদর্শ-উদ্দেশ্য, যত নীতি-নিয়ম ও পথ সবকিছুর মধ্যে প্রজ্ঞার স্থান মূখ্যতম। দান-শীলাদি পারমিতার সাধনা দ্বারা চিত্ত সম্যকরূপে বিশোধিত ও সমাহিত হলেই প্রজ্ঞার উদয় ঘটে। অন্যসব পারমিতা প্রজ্ঞার পরিবার সদৃশ। সমগ্র কুশলকর্মের উদ্দেশ্য প্রজ্ঞারই জন্য ইহাই বৌদ্ধধর্মের মূলনীতি। অতএব জীবন দুঃখের অবসান ঘটাতে হলে প্রজ্ঞার সাধনা একান্ত প্রয়োজন। প্রজ্ঞা দ্বারা পরিশোধিত না হলে দান শীলাদী কোনরূপ কুশলকর্ম পারমিতারূপে পরিগণিত হতে পারে না। প্রজ্ঞা শাসিত ও শোধিত দান শীলাদি ক্লেশ ও জীবন্মুক্তির পরিপন্থী ধর্মকে সমূলে ধ্বংস করে পরমার্থতত্ত্ব প্রাপ্তির জন্য হেতু সম্পদ হয়ে থাকে। সূর্যমন্ডল যেমন চার মহাদ্বীপকে আলো দ্বারা উদ্ভাসিত করে, তেমনি প্রজ্ঞাই অন্য সব সাধনাকে সমুজ্জ্বল করে। প্রজ্ঞাচক্ষুর অভাবে সমগ্র জগৎ মোহান্ধকারাচ্ছন্ন। চিত্তের সম্যক স্থৈর্যকে সমাধি বলে। সম্যক সমাহিত চিত্ত প্রজ্ঞালোকে প্রকাশিত। পরমার্থতত্ত্ব ব্যক্তি উপলব্ধি করতে সক্ষম হলে বা ভবের প্রকৃত সত্য-স্বরূপ সম্বন্ধে প্রজ্ঞালাভ করলেই চিত্ত নির্বাণে আরোপিত হয় এবং তখন তাঁর চক্ষে প্রতিভাত হয় যে, ভব ও নির্বাণ দুই আলাদা বস্তু নয়। নির্বাণ সত্য, শাশ্বত ও অবিনশ্বর। কাজেই ভবের সত্যতা উপলব্ধিই নির্বাণ। এরূপ অনন্ত জীবনের অধিকারী মহামৈত্রী, শীলবান, প্রজ্ঞাবান পূজনীয় শীলানন্দ ভিক্ষু (ধুতাঙ্গ ভান্তে) আমাদের সকলের কাছে আজীবন পূজনীয় নমস্য হয়ে থাকবেন। আমরা তাঁর দীর্ঘজীবন কামনা করছি যাতে যাবতকাল পরপারের ডাক না আসে, ততদিন পর্যন্ত পূজনীয় ভান্তের ধর্মদেশনা, ধর্মশিক্ষা আমাদের অন্তরজগত আলোকিত করে আমাদেরকে সুগতির পথে নিয়ে যায়। আমরা যেন তাঁর আদর্শের অনুসারী হয়ে ধর্মময় জীবন গঠন করতঃ মানবজীবনকে সার্থক করতে পারি পূজনীয় ভান্তের নিকট এই আশীর্বাদ প্রার্থনা করছি।

পৃথিবীতে প্রজ্ঞাই শ্রেষ্ঠ

প্রজ্ঞাদ্বারা মানুষ অসংষ্কার ধর্মে সন্তুষ্ট চিত্তে আনন্দ লাভ করে,

তার সংসার চক্রের পরিসমাপ্তি ঘটে

এবং সে প্রকৃত ধর্ম বুঝতে পারে।—- মলবর্গ

 

লেখক – কলাম লেখক, প্রাবন্ধিক

 

 

সম্মন্ধে ela mutsuddi

এটা ও দেখতে পারেন

খুব সংক্ষেপে মহাসতিপট্ঠান সহায়িকা

একূশটি উপায়ে অরহ্ত্ত্ব লাভের উপায় তথা কর্মস্থান সংযূক্ত গভীর অর্থসংযুক্ত মহাসতিপট্ঠান সূত্তI এখানে একুশটি উপায়ে …

Leave a Reply