ব্রেকিং নিউজ

সংসারচক্রে ঘূর্ণায়মান নারী

সংসারচক্রে ঘূর্ণায়মান নারী

ইলা মুৎসুদ্দী

16

কুশলকর্মে বিশ্বাস রাখ এবং পুণ্যার্জন কর,

অবিশ্রান্তভাবে পুণ্যকর্ম সম্পাদন কর,

জান এবং বিশ্বাস রাখ যে, পুণ্যকর্মের সুফল আছে,

অবশেষে সবকিছু (স্বচ্ছ পানির মতো) পরিষ্কার হবে।

পন্ডিতবর্গ (০৩) (১৭)

সংসার-ছোট্ট একটি শব্দ। আর এই শব্দের সাথে নিহিত রয়েছে, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না, সংযোগ-বিচ্ছেদ এর সংমিশ্রণ। আর এই সংসারের ঘুূর্ণায়মান চক্রে আবহমান কাল ধরে নারীরা ঘূর্ণিপাকে আবর্ত হয়ে রয়েছে। খুব অল্প সংখ্যক নারী এই ঘূর্ণিপাক থেকে বের হতে পেরেছেন। নারীরা এই ঘুর্ণিপাকে ঘূরপাক খাচ্ছেন। বেশীরভাগ নারী শারীরিক কিংবা মানসিক নির্যাতনের শিকার। কোনকিছুই নিজের ইচ্ছানুযায়ী সদ্ধর্ম চেতনা নিয়ে করতে পারে না। সবসময় পরনির্ভরশীল হয়ে থাকতে হয়। অনিচ্ছাকৃতভাবে পাপকর্ম সম্পাদন করতে হয়। যেমন স্বামী বা পরিবারের অন্য কোন সদস্য যদি বাজার থেকে জীবিত মাছ এনে দেন, তাহলে না কেটে তো আর রেহাই পাবে না। এরকম হাজারো উদাহরণ পাওয়া যাবে। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যাবে, নারীরা সংসার চক্রে উন্নত নরকে বসবাস করছেন। সংসারে কোন প্রকার সমস্যা হলে সব দোষ নারীদের উপর গিয়ে পড়ে।

অধিক সংখ্যক নারী অসহায়ের মতো জীবন যাপন করেন। আবার অনেকে মনে করেন, প্রতিদিন রান্না করছি, খাচ্ছি, ঘুমাচ্ছি, খুব তো সুখে আছি। আমার আর কি দরকার। যখন কোন পূর্ণিমা বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান হবে সেদিনই বুদ্ধ বিহারে যাবো। এজন্য বুদ্ধ ”ধম্মপদ”-এ বলেছেন—যে ব্যক্তি জাগ্রত থাকে, তার রাত্রি দীর্ঘ হয়। আর পথশ্রান্ত পথিকের কাছে পথ হয় অতিদীর্ঘ। আর যেসকল ব্যক্তি সদ্ধর্ম বুঝেন না, তাদের কাছে সংসার চক্র, সংসার ভ্রমণ হয় দীর্ঘ।

বর্তমান সময়ে কিছুটা পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। সচেতনতা বাড়ছে, তবে তাও খুবই স্বল্প সংখ্যক।

আজ মরি কি মরি কাল, মরণের কি আছে কাল

তৈরী থাক সর্বকাল, কর স্মৃতি মরণং।

যে কোন মুহুর্তে মৃত্যু এসে আমাকে নিয়ে যেতে পারে। মরণের কোন কালাকাল নেই। এই কথাটি আমাদের প্রতি মুহুর্তে স্মরণ রাখা খুবই প্রয়োজনীয়। তাহলেই আমাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে। একজন মানুষ যতদিন পর্যন্ত স্রোতাপত্তি মার্গফল লাভ করতে পারবে না, ততদিন তার জন্য চারটি অপায়দ্বার খোলা। তির্যক, নরক, প্রেত এবং অসুরলোক। মনুষ্যলোক অর্থাৎ মানবকুলে জন্ম নেওয়া খুবই দুর্লভ। অনেকে মনে করেন এত দান ধর্ম করেছি, নিশ্চয় পরজন্মে রাজা-মহারাজা হয়ে জন্ম নিব। আসলে তা এত সহজ নয়।

”হাজার জন্ম, লক্ষ জন্ম, কোটি জন্ম মানুষ হিসাবে এভাবে অগণিত কোটিবার জন্ম নেওয়ার পর নাকি এক জন্মে মাত্র ধর্মচেতনা জাগ্রত হয়।” সেদিক দিয়ে আমরা তো মহা ভাগ্যবান এবং পুণ্যবান। একে তো মনুষ্যজন্ম লাভ করেছি, বৌদ্ধ কূলে জন্ম নিয়েছি, সেই সাথে ধর্মচেতনা কিছুটা হলেও জাগ্রত হয়েছে। জাগ্রত চেতনাকে আরও শাণিত করতে হবে। বুদ্ধ বলেছেন, ”চেতনাকে আমি কর্ম বলি”। সংসারের ঘূর্ণিপাক থেকে নারীদের বের হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। নাহলে শুধু এই জন্ম নয়, জন্ম-জন্মান্তর এই সংসার চক্রে ঘুরে ঘুরে থাকতে হবে। মুক্তির আশা নেই। বেশীরভাগ মানুষ মনে করে, আমি তো পঞ্চশীল পালন করি, মাঝে মধ্যে অষ্টশীলও নিই। আমি নির্বাণ লাভ করতে পারব। আমি স্বর্গে অথবা দেবলোকে যেতে পারব নিঃসন্দেহে। এটা একেবারে ভুল ধারণা। হয়তো কোন এক জন্মে যাবেন। তাও কত কল্প পরে তার ঠিক নাই। দান আর শীলের মধ্যে থাকলে চক্রাকারে ঘুরতে থাকবেন। কখনো আপনি বের হতে পারবেন না। আমরা জানিনা, মৃত্যুর সময় কি নিমিত্ত এসে আমাদেরকে গ্রাস করবে। আমরা সকলেই জানি এবং পাঠ করি,

শমনে ধরিবে যবে, সুন্দর নিমিত্ত পাবে

সজ্ঞানে মরণ হবে, করস্মৃতি মরণং। — অর্থাৎ যাদের চিত্ত স্থির, স্মৃতিময় একমাত্র তারাই মৃত্যুর সময় সুন্দর নিমিত্ত নিয়ে সজ্ঞানে মৃত্যুবরণ করেন। সেজন্য আমাদের সবসময় স্মৃতি রাখার চেষ্টা করতে হবে। কিভাবে করবেন? তাহলে আপনার বিদর্শন ভাবনা চর্চা এবং অনুশীলন করতে হবে। এজন্য সময় বের করে নিতে হবে। কারণ মৃত্যুসময় যখন উপস্থিত, তখন মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয় স্বজন বলে কোন সহায় নেই। কেউ তখন কাউকে উদ্ধার করতে পারবে না। এটা ”দুঃখসত্য”। আমাকে চলে যেতে হবে, মরতে হবে, এটা বড় দুঃখময়, সংসারটা দুঃখময় বলে বুঝতে হবে।

অভ্যাসগত কর্ম সৃষ্টি করুন ঃ মরবার আগে হুঁশ না থাকলে কিভাবে বুদ্ধ, ধর্ম , সংঘ স্মরণ করবেন? সেজন্য বুদ্ধ বলেছেন —- প্রত্যেকদিন সকাল দুপুর সন্ধ্যা যাঁরা বুদ্ধের আসনে পূজা দিবেন, ছোঁয়াইং তুলবেন, তাঁদের এটা অভ্যাস হয়ে যাবে। এটাকে বলে অভ্যাসগত কর্ম। এই কর্মটা খুবই শক্তিশালী। যে মানুষ এভাবে অভ্যাসগত কর্ম পালন করে, মরবার আগে নাকি সেই অভ্যাসগত কর্ম এসে তাকে ভালো জায়গায় অর্থাৎ সুগতি স্বর্গলোকে নিয়ে যাবে। কারণ সংসারে থাকলে ইচ্ছাকৃত এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে অনেক অকুশল কর্ম সম্পাদিত হয়। যারা প্রতিনিয়ত কুশলকর্মে নিয়োজিত থাকেন না, তাদের অকুশল কর্ম গ্রাস করে বেশী। কারণ মার তো সবসময় আমাদের পিছনে লেগে আছে অকুশল কর্মের প্রতি আকৃষ্ট করানোর জন্য।

 

এবার বলি নারীদের কি কি অসুবিধা? কেন তারা এগিয়ে যেতে পারেন না?

১। একজন নারী সকাল থেকে রাত অবধি সংসারের পিছনে সময় ব্যয় করে। সকাল থেকে শুরু হয় কর্মযাত্রা। স্বামী, সন্তান, শ্বশুর-শ্বাশুড়ী থেকে শুরু করে পরিবারের সকল সদস্যের দেখাশোনা, অতিথি আপ্যায়ন, বাচ্চাদের ষ্কুলে আনা-নেয়া, স্বামীর খাবার রেডি করে দেয়া, রান্না করা —- এগুলো করতে করতে নিজের জন্য একটু সময়ও থাকে না।

২। দেখা গেল আজকে বুদ্ধ বিহারে কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠান আছে, যাওয়ার জন্য কোনরকমে সব কাজ সেরে তৈরী, ঠিক সেই মুহুর্তে স্বামী অথবা শ্বশুর একগাদা বাজার করে এনে হাজির। এখন কি করবে? বাজার সামলাবে না বিহারে যাবে। যদিওবা বিহারে যান, দেখা যায় মন পড়ে থাকে বাসায়। কারণ বাসায় গিয়ে আবার সেই যুদ্ধ শুরু হবে। এই অবস্থায় অর্থাৎ অস্থির চিত্তে কখনও ধর্ম হয় না।

৩। আরেকটি সমস্যা হয়, যেমন একজন নারী চিন্তা করল-কালকে তো সংঘদান আমি নির্দিষ্ট কিছু জিনিস দান করব। ১০০ টাকা লাগবে। স্বামীর কাছে চাইতে গেলে স্বামী ৫০/- টাকা দিলেন। এতে উনার মনে দুঃখ উৎপন্ন হল। অর্থাৎ ইচ্ছেমতো দানও করতে পারছে না।

৪। সকালে বা বিকালে কোন সময় একটু বুদ্ধ বিহারে যেতে চাইলেও পরিবারের অসহযোগীতার কারণে অনেকে যেতে পারেন না।

** অনেকে সুযোগ পেয়েও কাজে লাগান না। বলে থাকেন, ছেলে-মেয়েকে বিয়ে দিয়ে তারপর ধর্ম করব। আসলে বৃদ্ধ বয়সে ধর্ম হয় না। তখন নানা রোগ-ব্যাধি শরীরে বাসা বাধে। জরায় আক্রান্ত শরীর নিয়ে কিছুই করার থাকে না। তখন দেখা যাবে, ছেলের বউ, নাতি-নাতনী পাহারা দিতে দিতে ধর্ম কাজে যাওয়া হচ্ছে না। উপেক্ষা জ্ঞান লাভ করুন। বুঝতে হবে তার কর্ম তার। আমার কর্ম আমার। সংসার দুঃখ অনাত্মময় বলে চিন্তা করুন।

এভাবেই নারীদের প্রতি পদে পদে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। এই প্রতিবন্ধকতা সমূহ দূর করতে চাইলে কায়-মনো-বাক্যে স্থির চিত্তে শীল পালন করতে হবে। কারণ স্থির চিত্তে শীল পালন করলে এবং কায়িক, বাচনিক, মানসিক ভাবে পাপ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করলে আপনি নিশ্চিত সফল হবেন। কারণ আপনি শীলময় পূূণ্যের কাছে যা প্রার্থনা করবেন, তাই পাবেন।

উল্লেখ্য নারীরা কিন্তু ধর্ম-কর্ম বেশী করে। দেখা যায়, যে কোন ধর্মানুষ্ঠানে পুরুষের চাইতে নারীর সংখ্যাধিক্য। এজন্য নারীদের সচেতন হতে হবে। বুদ্ধ বলেছেন, ধর্মকাজ করার আগে মনকে স্থির করতে হবে। বৌদ্ধ ধর্ম আচরণের ধর্ম। বাহ্যিকভাবে লোকাচারের কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। যেমন আপনি ধর্মদেশনা শুনতে বসেছেন। ধর্মদেশনা শুনতে বসে পাশের মহিলাটির সাথে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছেন। এতে করে সভার সৌন্দর্য্য নষ্ট হচ্ছে, আপনার পাপ হচ্ছে। কারণ একজন দেশক ভিক্ষু যখন ধর্মদেশনা করেন, ঐ ধর্মসভায় অনেক দেবতা, ব্রক্ষ্মরা উপস্থিত হন। যাদেরকে আমরা চর্ম চক্ষু দিয়ে দেখতে পাইনা। ধর্মসভায় কথা বললে দেবতারা অসন্তুষ্ট হন। এগুলো মনে রেখে ধর্মদেশনা শোনা বাঞ্চনীয়। পূজনীয় উপপঞঞা জোত থের ভান্তে মহোদয় এক দেশনায় বলেছিলেন, ধর্মদেশনা সভায় কথা বলার ইচ্ছে থাকলে ধর্মদেশনা শুনতে না এসে বাসায় ঘুম যাওয়াও অনেক উত্তম। কারণ বাসায় ঘুম গেলে পাপ হবে না, কিন্তু ধর্মদেশনা শুনতে এসে কথা বলে সভার অন্তরায় ঘটালে মহাপাপ হয়।

তাই বলছি, সময় থাকতে সাধন করা ভালো। আপনি যে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত বাঁচবেন তার কোন নিশ্চয়তা নেই। যে কোন মুহুর্তে এই সংসার, ছেলে-মেয়ে, পরিবারের সকলকে ফেলে একাকী চলে যেতে হবে। কেউ আপন নয়। মৃত্যুর সময় যদি আমার ছেলে, আমার স্বামী চিন্তা করেন, তাহলে সোজা প্রেতলোকে উৎপন্ন হতে হবে। এখনই সচেষ্ট হোন। আপনি সুকর্ম কিংবা দুষ্কর্ম যেটাই করেন না কেন, তা-ই মৃত্যুর সময় নিয়ে যাবেন। আর কিছুই নিয়ে যেতে পারবেন না। তাই বেশী বেশী করে কুশল কর্ম করুন। পুরুষরা যে কোন মুহুর্তে যে কোন কুশল কর্ম সম্পাদন করতে পারে। কিন্তু নারীরা তা পারে না। পুরুষরা একবার শ্রমণ হলে, ভবিষ্যতে কোন এক জন্মে শ্রাবক বুদ্ধ হওয়ার বীজ বপন করে। পুরুষরা সংসার ত্যাগী হতে পারেন। নারীদের সেই সুযোগ নেই। তাই আর যাতে নারী হয়ে জন্ম নিতে না হয় এবং বর্তমান নারী জন্ম সার্থক করে যাতে মৃত্যুবরণ করতে পারেন, সেই চেষ্টা করুন। যে কোন অষ্টপরিষ্কার দান নিজে করুন কিংবা অংশগ্রহন করুন এবং প্রার্থনা করুন, এই পুণ্যের ফলে যাতে আর কোন জন্মে নারী হয়ে জন্ম নিতে না হয়।

অবিবাহিত নারীদের বলছি, এখন ধর্ম করার সুসময়, সুক্ষণ, সুপ্রভাত। কারণ এখন কোন পিছুটান নেই। সংসারের ঝামেলা নেই। এখন যারা বেশী বেশী দান, শীল, ভাবনা করবেন, তারা সংসার জীবনে গিয়েও শান্তি পাবেন, ধর্ম কাজ করার অনুকূল পরিবেশ পাবেন। কবি বলেছেন, এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়। বুদ্ধ বলেছেন, মানুষের জীবনের প্রথম ভাগে অর্থাৎ যৌবনকালে সাধনা করলে যতটুকু ধর্মচক্ষু খুলবে বা যে ধর্মজ্ঞান লাভ আমরা করব, তার চাইতে অর্ধেক লাভ করতে পারব মধ্যবয়সে সাধনা করলে। যদি শেষ বয়সে সাধনা করেন, কিছু নাও পেতে পারেন। পরিশেষে বুদ্ধের উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করছি ঃ

অতিক্রান্ত প্রতিটি দিন ও রাতের সাথে আমাদের জীবন ফুরিয়ে আসছে,

(তাই) যতক্ষণ সময় আছে উদ্যমশীল হয়ে কাজ কর,

পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার সবই অনিত্য,

সুতরাং মোহগ্রস্ত হয়ে অন্ধকারে পতিত হয়ো না।

জরাবর্গ (১৩) (৩২)

সম্মন্ধে ela mutsuddi

এটা ও দেখতে পারেন

খুব সংক্ষেপে মহাসতিপট্ঠান সহায়িকা

একূশটি উপায়ে অরহ্ত্ত্ব লাভের উপায় তথা কর্মস্থান সংযূক্ত গভীর অর্থসংযুক্ত মহাসতিপট্ঠান সূত্তI এখানে একুশটি উপায়ে …

Leave a Reply