ব্রেকিং নিউজ

☸ধর্মালোচনা করতে গিয়ে কেন যুদ্ধক্ষেত্র-মনকষ্ট-মহাপাপ? জ্ঞানীর চেয়ে ধ্যানী বড়☸

এক রাজা, এক হাতী এবং জন্মান্ধ কয়েকজন অন্ধকে তার সম্মুখ এনে তাদের আদেশ করলেন হাতীটা স্পর্শ করে হাতীর সংজ্ঞা দিতে। যে অন্ধটা হাতীর লেজ ধরেছিল, তার কাছে হাতি হচ্ছে ঝাড়ুর মতো। যে পা ধরেছিল তার কাছে গাছের মতো। যে গায়ে হাত দিয়েছিল তার কাছে দেয়ালের মতো। আর যে অন্ধ কান ধরেছিল তার কাছে কুলোর মতো। অতএব হাতীর সংজ্ঞা তাদের এক এক জনের কাছে এক এক রকম হয়ে দাড়াল এবং প্রত্যেকে তার নিজস্ব হাতীর সংজ্ঞা একমাত্র সত্য বলে ঝগড়া শুরু করলো যা হচ্ছে আমাদের জীবনে প্রতিনিয়ত। তারা বুঝতে পারেনি যে তারা প্রত্যেকে হাতীর এক একটা দেহাংশ ধরেছিল মাত্র। প্রত্যেক অন্ধের বক্তব্য ছিল মাত্র এক পাক্ষিক সত্য। তারা একে অন্যের প্রতি যুক্তি আরোপ করতে শুরু করল নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে। যুক্তির শেষ পরিণতি ঝগড়া এবং হাতাহাতিতে রূপ নিল।
উল্লেখ্য শুধু অন্ধ কেন, ধ্যান সাধনাকারী এবং দার্শনিকগণ ও একে অপরে সাথে ঝগড়া বিবাদে জড়িত হন। কারণ, কেবলমাত্র তারা শুধু সত্যের একটা দিক দেখেন কিংবা কোন বস্তুর একটি অংশে মাত্র দৃষ্টি রাখেন। তারা তাদের মতবাদকে দৃঢ়ভাবে আকড়ে থাকেন। অভিজ্ঞতা বহুমূখী। অতএব, দৃষ্টিভঙ্গীও বহুমূখী। যদি সত্য বহুমুখী হয়, তা’ একপাক্ষিকভাবে বর্ণনা করা কী ঠীক? আর তাই বুদ্ধ বলেছেনঃ “আমি জগতের সাথে বিবাদ করিনা, যদিও জগত আমার সাথে বিবাদ করে। যিনি সমগ্র সত্য সম্পর্কে পরিজ্ঞাত, তিনি এই জগতের সাথে বিবাদ করতে পারেন না”। তথাগতের দৃষ্টিভঙ্গী হলো জগতে কারোর সাথে সংঘাতে লিপ্ত না হওয়া, সে মনুষ্য, দেব কিংবা পিশাচ-ই হোক না কেন।
উল্লেখ্য সমাধি অনুশীলনকারীগণ যখন নিজ মতবাদ সর্বস্ব হয়ে পড়েন তখন তারা সত্য (ধর্ম) দর্শনে অসমর্থ হন কারন, “মতবাদ’ লোকজনকে বিভাজন করে ফেলে। এমন কি যারা তাদের চিত্তের উন্মুক্ততা এবং বিশুদ্ধতা চান তারাও এ দোষে জড়িত হয়ে পড়েন। এটা নিশ্চিতরূপে সংঘাত এবং বাক্যবাণ ছোড়াছুড়ির কারণ হয়ে দাড়ায়। ধ্যান এবং চিত্ত বিশুদ্ধি আমাদেরকে প্রীতি, অনুকম্পা এবং সহিস্নুতা শেখানোর কথা। তাই যদি হয়, তাহলে “সত্যের’ নামে কি করে ‘যুক্তিহীন-দৃঢ়-মতবাদ’ বিরাজ করতে পারে? এই মর্মে বলা হয়, যদি পুর্ব-ধারণাকৃত বিশ্বাসের সঞ্ঞ্ার প্রতি অনুরক্ত থাকো তাহলে সত্য ধর্ম হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভবপর হয় না।
যেমনঃ এক প্রফেসর জেন-শিক্ষকের নিকট গিয়েছিলেন- জেন-এর অর্থ কি জানতে। জেন-শিক্ষক নিশ্চুপভাবে একটা কাপে চা ঢালতে লাগলেন। কাপটা ভর্তি হয়ে গেল তবুও অবিরাম ঢালতে লাগলেন। প্রফেসর সেটা আর সইতে পারলেন না, তাই অধৈর্য্ হয়ে শিক্ষককে প্রশ্ন করলেন, “কাপটি ভর্তি তবুও আপনি ঢেলেই চলেছেন কেন?” শিক্ষক বললেন, “আমি যা করছি সে বিষয়টা আপনার কাছে তুলে ধরতে চাইছিলাম, আপনিও জেন সম্পর্কে ও ঠিক সেভাবে জানতে চেষ্টা করছেন। আপনার চিত্ত জেন সম্পর্কে যে ধারনায় বশীভুত তাকে একমাত্র প্রাধান্য দিয়েই উপুর্যপরি আপনি জেন সম্পর্কে জানতে চাইছেন। জেন সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমে আপনি আপনার পূর্ব-ধারণাকৃত চিত্তকে শুন্য করুন। অনুগ্রহ করে পূর্ব-ধারণা হতে বিমুক্ত হন এবং খোলা চিত্তে ধর্মালোচনা করুন।
কালাম সুত্রে ভগবান বুদ্ধ বিশদভাবে বর্ণনা দিয়েছেন, যে কোন মতবাদ অন্দ্বভাবে বিশ্বাস না করে সর্বদা পরীক্ষা এবং বিচার বিশ্লেষন করা উচিত। এবার দেখ যাক মিলিন্দ প্রশ্নের মীমাংসা প্রশ্ন এ যেভাবে ধর্মালোচনা উক্তঃ
রাজা বলিলেন, “ভন্তে নাগসেন, আপনি আমার সঙ্গে শান্ত্রালোচনা করিবেন কি?”
“মহারাজ, যদি আপনি পন্ডিতগণের ন্যায় আলোচনা করেন তবে অবশ্যই আলাপ করিব । আর যদি রাজাদের ন্যায় আলাপ করেন তবে করিব না।
“ভন্তে নাগসেন, পন্ডিতেরা কিরূপে শান্ত্ববিচার করেন?”
“মহারাজ, পন্ডিতগণ শাস্ত্রবিচারে একে অন্যকে আবেষ্টিত করেন আবার আঝেষ্টনমুক্তও করেন। পরস্পরকে নিগ্রহও করেন, নিগ্রহের প্রতিকারও করেন। পরস্পরকে বিশ্বাসও করেন, খন্ডনও করেন। ইহাতে কিন্তু কেহ কোপিত হন না । মহারাজ, এই প্রকারেই পন্ডিতগণ শাস্ত্রালাপ করেন ।”
“ভন্তে, রাজারা কী প্রকারে শাস্ত্রালাপ করেন?”
“মহারাজ, রাজারা আলাপ করিবার সময় একটি বিষয় পুর্ব ধারনাকৃতভাবে মানিয়া লন। যিনি সে বিষয়ের ব্যতিক্রম করেন তাহার দন্ড বিধান করেন, “ইহাকে এই দণ্ড দাও ।’ মহারাজ, এই প্রকারেই রাজারা আলাপ করিয়া থাকেন।”
“ভন্তে, আমি পন্ডিতের ন্যায় আলাপ করিব, রাজার ন্যায় আলাপ করিব না।
বর্তমানে উল্লেখ্য আর একটি হলোঃ অর্থকথা, টীকা এবং অনুটিকা ছাড়া বাংলা ত্রিপিটকঃ অর্থকথা বা টীকা বা অনুটীকা ছাড়া ত্রিপিটক পড়া অসম্ভব সম কারন তাতে ভুল বোঝার অবকাশ থাকবে অনেক বেশী। বিষয়টি পরিস্কার করার জন্য – অর্থকথা বলতে কি বুঝায় বা কেন এর ব্যাখা সংক্ষেপে- বুদ্ধেরবাণী সমূহ সবার পক্ষে হৃদঙ্গম করা সহজ নয় ফলস্বরুপ বুদ্ধের জীবিতকালেই তাঁর ধর্মোপদেশের বিভিন্ন বিষয় অর্থসহকারে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন হতো । বুঝার সুবিধার্থে বুদ্ধবাণীর দুর্বোধ্য দ্ব্যর্থক, উহ্য এবং জটিল বিষয়সমূহ পন্ডিত ভিক্ষুগণ অর্থসহকারে ব্যাখ্যা করতেন।
এক, সেই অর্থ ও ব্যাখ্যাসমূহ সংকলিত হয়ে অট্ঠকথার রুপ ধারণ। অট্ঠকথা বলতে অর্থকথা, ভাষ্য, অর্থবর্ণনা, অর্থবাদ, ব্যাখ্যা ইত্যাদি বুঝায়।
কিংবা পরে দুই, বলা যায় ত্রিপিটকের অনেক জটিল, দুর্বোধ্য, ও উহ্য পদ বা বিষয় রয়েছে যা সকল শ্রেণির পাঠকের নিকট সহজে বোধগম নয়। সে সব পদ বা বিষয়সমূহ সমার্থক বা প্রতিশব্দ, উদাহরণ উপমা, গল্প, ব্যাখ্যা ইত্যাদি সাহায্যে সরল-সহজভাবে অট্টকথায় উপস্থাপন করা।
তিন, যখন যে কোন কিছু এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদ করা হয় তখন অবশ্যি তা কিছুটা হলে ও অর্থ হারিয়ে ফেলাটা অস্বাভিক নয় সে ক্ষেত্রে ও পরিত্রান পেতে অর্থকথা, টীকা এবং অনুটিকার প্রয়োজন অনস্বীকার্য্য।
ত্রিপিটকের মূল বইগুলো পড়ার সময় যেমন অর্থকথা, টিকা ও অনুটিকা বইগুলো সঙ্গে প্রয়োজন ঠিক তেমনি ত্রিপিটকের মূল বইগুলো পড়া শুরু করার আগে ত্রিপিটক রেফারেন্স গাইড বা প্রশ্নোউত্তরে ত্রিপিটকের মতো বইগুলো না পড়লে ও পাঠকের হারিয়ে যাবার সম্ভাবনা কম নয়। সে ধরনের একটি উদ্দেশ্য নিয়েই কিছুদিন আগে পোষ্ট করেছিলাম “এক নজরে ত্রিপিটক পরিচিতি নামে একটি লেখা সংক্ষেপে” সে লেখাটি ভবিষ্যতে আর ও বিশদ ও বিস্তারিত ও তথ্যসমৃদ্ধ করার ইচ্ছা আছে।
উক্তভাবে ত্রিপিটক অধ্যয়ন করলেই যে ত্রিপিটক বিশারদ হওয়া যাবে ঠিক তা নয় তবে অনেক সাধারন বিষয়ে মিথ্যা দৃষ্টি থেকে পরিত্রান পাওয়া যাবে। যেমন অল্প বয়সে শ্রমণ হওয়া যাবে না বলে উল্লেখ আছে কারন অল্প বয়সে শীল পালন করা সহায়ক হবে না আবার তেমনি ত্রিপিটকেই পাবেন তথাগত সোপক শ্রমণকে অল্প বয়সে শ্রামন্য ধর্মে দিক্ষা দিয়েছেন কারন উনার বয়স সময়ের মাপে অল্প হলে ও উনার মানসিক বয়স ছিল পরিনত। দুটিই সঠিক করেছেন। কিন্তু আমি আপনি যদি প্রথমটি পড়ে এবং ২য়টি না পড়ে প্রথমটিকে নিয়েই ঝগড়া-বিবাদ বাধিয়ে বসি তবে দোষটা কার? ঝগড়া-বিবাদ এ যা সৃষ্টি হবে তা সাধারনের ভাষায় সময় নষ্ট বরং সে সময়টা নষ্ট না করে কয়েকবার পুরো ত্রিপিটক পড়ার কথা ভাবুন অর্থকথা, টীকা এবং অনুটিকা সহযোগে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কয়েকবার এভাবে পড়লে কি তা আত্নস্থ হবে? এক কথায় বলা যায় না – কারন দান-শীল-সমাধি ও প্রজ্ঞার অভাব হলে বরং কনফীউজড ডট কমে পরিনত হবেন।
তবে পরিশেষে সংক্ষেপে এবং সংকীর্ণতার সাথে উল্লেখ না করে পারছি না, জ্ঞানীর চেয়ে ধ্যানী বড়, মনে করুন কেউ পদার্থ বিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রিধারী তিনি খুব ভালো করেই জানেন বরফ কেন পিচ্ছিল এবং তার অর্থ, তার সুত্র কিন্তু তিনি যখন শীলে প্রতিষ্ঠিত নন তদুপরি মদ খেয়ে মাতাল তদ্বাবস্থায় উনি কিন্তু বরফে ঢাকা স্থানে হেটে যাওয়ার সময় জ্ঞানীর সে জ্ঞান থাকবে না এবং তিনি হোচট খাবেন অথচ একজন ধ্যানী ধরে নিন যার পদার্থ বিদ্যার জ্ঞান নেই তিনি জানেন না বরফ পিচ্ছিল হওয়ার গুঢ়ার্থ কিন্তু তার পা মাটিতে পড়ার সাথে সাথেই কিন্তু তিনি বুজতে পারবেন- বরফ পিচ্ছিল।

সম্মন্ধে SNEHASHIS Priya Barua

এটা ও দেখতে পারেন

মেডিটেশান এবং আপনার ব্রেইন

Leave a Reply