ব্রেকিং নিউজ

🖋সংক্ষেপে বিদর্শন ভাবনা পদ্ধতি তৃতীয় পর্বঃ✍️

এ পর্বে আবার ও একি বিষয়ের অবতারনা তবে বলার ছল ভিন্ন এবং কিছু বিষয় এখানে পুর্বের চেয়ে সহজ করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে তদুপরি পরিশেষে যুক্ত করা হয়েছে স্মৃতির বিশ্লেষন।
🌻বিদর্শন ভাবনা মূলতঃ অনুত্তর সম্যক সন্বোধি জ্ঞানপ্রাপ্ত মহাকারুণিক তথাগত বুদ্ধেরই নির্দেশিত সতিপট্ঠান ভাবনা বা স্মৃতিপ্রস্থান ভাবনা। স্মৃতির বারংবার উপস্থাপন বা প্রস্থাপনই স্মৃতি প্রস্থান ভাবনা। বার বার অবিচ্ছিন্ন স্মৃতিচারণ কিংবা স্মৃতির পুনরাবৃত্তি করাই হচ্ছে স্মৃতি প্রস্থান বা বিদর্শন ভাবনা। জগত ও জীবনের যথাযথ দর্শন জ্ঞানই বিদর্শন। বিশেষতঃ পঞ্চক্কন্ধ বা নামরূপের যথাযথ দর্শন জ্ঞানই বিদর্শন। এ পঞ্চঙ্কন্ধ বা নামরূপ অনিত্যধর্মী, দুঃখপূর্ণ ও অনাত্মময়, ভাবনার মাধ্যমে সমাহিত চিত্তের এরূপ বিশ্লেষণমূলক জ্ঞানই বিদর্শন। এ জ্ঞানের উৎপাদন ও বর্ধনের নাম বিদর্শন ভাবনা। এ বিদর্শন ভাবনা মূলতঃ পঞ্চস্কন্ধের ভাবনা। পঞ্চক্কন্ধ হচ্ছে রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান। রূপ হচ্ছে আমাদের এ দেহ বা কায়া; বেদনা হচ্ছে এ দেহের সুখ-দুঃখ অনুভূতি | বেদনা বা অনুভূতি থেকেই সংজ্ঞা ও সংস্কারের উৎপত্তি এবং বিজ্ঞান হল চিত্ত। এ পঞ্চস্কন্ধকে ভাবনার উদ্দেশ্যে ভগবান বুদ্ধ তাই চার প্রকারে নির্দেশ দিয়েছেন। যথা-কায়ানুদর্শন, বেদনানুদর্শন, চিত্তানুদর্শন ও ধর্মানুদর্শন। তবে এ ভাবনার ভিত্তি হচ্ছে শীল পালন বা শীলের অনুশীলন। শীলবিশুদ্ধি একান্ত প্রয়োজনীয়। ভাবনার প্রারম্ভে “আরক্ষা পাঠ” একান্ত প্রয়োজনীয়।
🌻পঞ্চস্কন্ধ = রুপস্কন্ধ+বেদনাস্কন্ধ+সংজ্ঞাস্কন্ধ+সংস্কারস্কন্ধ+বিজ্ঞানস্কন্ধ=নাম্রুপ
বেদনাস্কন্ধ+সংজ্ঞাস্কন্ধ+সংস্কারস্কন্ধ= চিত্ত-বৃত্তি
বিজ্ঞানস্কন্ধ=চিত্ত
🌺১. কায়ানুদর্শন ভাবনাঃ কায়ানুদর্শন মানে রূপ বা কায়ার অনুদর্শন অর্থাৎ এ কায়ার ক্ষুদ্রানুক্ষুদ্র অবস্থা ও স্বরূপ দর্শন বা জানা। কি প্রকারে আমাদের এ দেহ বা কায়াকে জানতে হয়? আমাদের এ পঞ্চস্কন্ধ শ্বাস-প্রশ্বাসের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল সে কারণে তথাগত বুদ্ধ
প্রথমতঃ শ্বাস-প্রশ্বাসের উপর স্মৃতি স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন। শ্বাস টান্লে “টান্ছি, টান্ছি’ এবং ফেল্লে “ফেল্ছি, ফেল্ছি” কিংবা পেট ফুল্লে “ফুল্ছে, ফুল্ছে” এবং কম্লে “কমছে, কম্ছে’ বলে প্রথম প্রথম স্মৃতির চর্চা করতে হয়। আজকাল পেটের “ফুলা-কমা”-তে স্মৃতি স্থাপনে ভাবনা পদ্ধতি বেশ প্রচলিত ও প্রশংসিত। এ ভাবনার নাম আনাপান স্মৃতি ভাবনা। এ আনাপান স্মৃতিচর্চার মাধ্যমে চিত্ত তার চঞ্চলতা পরিহার করে শান্ত ও একাগ্র হয় এবং চিত্তের স্থিরতার মাধ্যমে উন্নততর ভাবনায় অগ্রসর হতে হয়। এ ভাবনা মূল ভাবনায় যাবার অন্যতম পন্থা। এ স্মৃতি চর্চার সময়ে নানাবিধ নিমিত্ত অন্তর চোখে দর্শন হয়ে থাকে। যা কিছু দর্শন হোক না কেন, “দেখছি, দেখছি” বলে জানতে হয় যতক্ষণ না এ নিমিত্ত দূরীভূত হয়। শুনলে “শুনছি, শুনছি” বলে জানতে হবে। নিমিত্ত অদৃশ্য হলে পুনরায় ফুলছে, কমছে’ বলে স্মৃতির অবিচ্ছিন্রতা রক্ষা করতে হয়। এভাবে সাধক বা সাধিকা শ্বাস-প্রশ্বাসের উদয়-ব্যয় কিংবা উৎপত্তি-বিনাশ জেনে জেনে অবস্থান করতে থাকেন। এতে পঞ্চস্কন্ধের প্রতি ক্রমান্বয়ে তার অনাসক্তি ভাব চল আসে। তিনি বুঝতে বা উপলব্ধি করতে পারেন যে এ শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হলে এ পঞ্চস্কন্ধের কোন মূল্য নেই। এ কায়কে বা দেহকে “আমার” বলা সত্যিই ভুল। তাই এই কায়া “আমিও নই, আমারও নয়।” অর্থাৎ “আমি কাহারও নই, কেহ আমারও নয়”-এ ভাবনা চিত্তে ভাবিত হয়ে থাকে। এরূপে সাধক বা সাধিকা কায়ে কায়ানুদর্শী হয়ে অবস্থান করেন।
কায়ানুদর্শন ভাবনায় প্রথম প্রথম সাধক বা সাধিকাকে এ কায়ের চার ঈর্যাপথে স্মৃতি রাখতে হয়। চার ঈর্যাপথ হল দাড়ান, গমন, উপবেশন ও শয়ন। যখন যে অবস্থায় অবস্থান করা হয়, তখন সে অবস্থাকে সম্যকভাবে জানতে হয়। যেমন-দাড়ালে ‘দাড়িয়েছি গমন করলে ‘গমন করছি উপবেশন বা বসলে বসেছি” এবং শয়ন করলে “শয়ন করছি” বলে জানতে হয়। এ ভাবনার নাম চার ইর্যাপথে কায়ানুদর্শন ভাবনা। এ চার ইর্যাপথ ব্যতীত এ কায়ের আরও অনেক কৃত্য রয়েছে। যখন যে কৃত্য বা কাজ সম্পাদিত হয়, তখন তাকে সম্যকরূপে জানাই হচ্ছে সম্প্রজ্ঞান। অগ্রগমনে, পশ্চাদগমনে, দর্শনে, শ্রবণে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সক্কোচনে ও প্রসারণে, পোষাক-পরিচ্ছদ পরিধানে, ভোজনে, পানে, আম্বাদনে, মল-মূত্র বিসর্জনে,দাড়ানে, গমনে, উপবেশনে, শয়নে, জাগরণে, ভাষণে ও নীরবতায় আত্ম-বিস্মৃত না হয়ে সজ্ঞানে কায়ের প্রতি অবস্থাকে স্মরণ রাখাকেই বলা হয় সম্প্রজ্ঞান। এ ভাবনাকে বলা হয় সম্প্রজ্ঞানে কায়ানুদর্শন ভাবনা।
সম্মুখে যাবার সময় “যাচ্ছি, যাচ্ছি, এবং পেছনে ফিরে আসার সময় “ফিরে আস্ছি, ফিরে আস্ছি’-বলে জানতে হবে। তবে পা তোলার সময় “তুলছি, তুলছি”, পা নেয়ার সময় “নিচ্ছি, নিচ্ছি” এবং পা মাটিতে রাখা বা ফেলার সময় “রাখছি, রাখছি” বা “ফেলছি, ফেলছি” বলে- মনে মনে জানতে হবে। এ জানাটাই হচ্ছে স্মৃতি ভাবনা। চংক্রমণের সময়ও একই নিয়ম-“তুলছি, নিচ্ছি ও ফেলছি”। এ জানাটা হচ্ছে সম্প্রজ্ঞান বা বিদ্যা, না জানাটা অবিদ্যা। এ কায়ার প্রতিটি কৃত্যে এভাবে জানতে হয়। যে যে মুহুর্তে যে যে কাজ সম্পন্ন হবে, সে সে মুহুর্তে সে সে কাজ সম্পাদিত হচ্ছে বলে জানাটাই সম্প্রজ্ঞান। সম্প্রজ্ঞান মানে অবিচ্ছিন্নভাবে প্রতিটি কাজে স্মৃতিমান থাকা। নানাদিকে বিক্ষিপ্ত চিত্তকে সুস্থির করার মহান উদ্দেশ্যে এ সম্প্রজ্ঞান বা সম্যক স্মৃতিচর্চা।
ভাবনার বা স্মৃতিচর্চার সময় চোখ বন্ধ থাকবে। তা সত্তেও অন্তর চোখে কিছু দর্শন করলে নাম না ধরে শুধু “দেখছি, দেখছি” এবং শুনলে “শুনছি, শুনছি” বলে জানতে হবে, যতক্ষণ না এ দৃশ্যবস্তু অদৃশ্য হয় অথবা শোনার শব্দ বন্ধ হয়। হাত-পা বাড়ালে ‘হাত বাড়াচ্ছি’ বা “পা বাড়াচ্ছি’ এবং গুটালে “হাত গুটাচ্ছি’ বা “পা গুটাচ্ছি’ বলে সম্যকভাবে জানতে হবে। পোষাকাদি পরিধানে অর্থাৎ ভিক্ষু হলে অন্তর্বাস পরিধানের সময় “অন্তর্বাস পরিধান করছি”, গায়ের চীবর পরিধানের সময় “চীবর পরিধান করছি” এবং ভিক্ষাপাত্র নেয়ার সময় “ভিক্ষাপাত্র নিচ্ছি বলে বার বার সম্যক স্মৃতিমান হতে হবে। গৃহী হলে লুঙ্গি বা শাড়ী পরিধানকালে ‘লুঙ্গি পরছি’ বা শাড়ী পরছি” এবং সার্ট বা ব্লাউজ পরিধান কালে “সার্ট পরছি’ বা “ব্লাউজ পরছি’ বলে বার বার স্মৃতি পরায়ণ হতে হবে কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত। ভোজন করলে খাচ্ছি, খাচ্ছি’, জলপান আস্বাদন করছি, রস আস্বাদন করছি” এবং গিলার সময় “গিলছি, গিলছি’ বলে সম্যক স্মৃতিমান হতে হয়।
পায়খানা করার সময়, “পায়খানা করছি” এবংপ্রস্রাব করার সময় প্রস্রাব করছি” বলে বার বার স্মৃতিমান হতে হবে কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত। প্রতিটি কাজ সম্যকভাবে জানাই বিদ্যা, জানতে না পারা অবিদ্যা। গমন করলে “যাচ্ছি, যাচ্ছি”, দাড়ালে ‘দাড়াচ্ছি, দাড়াচ্ছি’, উপবেশন বা বসলে “বসেছি, বসেছি”, এবং শয়ন করলে “শুইছি, শুইছি বলে সম্যক স্মৃতিমান হতে হবে। ঘুম থেকে জেগে উঠলে “জেগেছি, জেগেছি” কথা বলার সময় “বলছি, বলছি” এবং চুপচাপ থাকার সময় “চুপচাপ আছি” বলে জানাটা বিদ্যা বা সম্প্রজ্ঞান, না জানা অবিদ্যা। এরূপে নিজ কায়ের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঞ্চালনে বা বিন্যাসে প্রবল উৎসাহ সহযোগে সজাগ বা সম্যক স্মৃতিমান থাকাটাই হচ্ছে সম্প্রজ্ঞানে কায়ে কায়ানুদর্শী হয়ে অবস্থান করা। উদ্দেশ্য হল স্বীয় চিত্তকে শান্ত ও সুসমাহিত করা। চিত্ত সমাধিস্থ হলে প্রজ্ঞার উৎপত্তি হয় এবং এ প্রজ্ঞাই ভাবনাকে গভীর হতে গভীরতর পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম। কায়ের অন্যতম ভাবনা হচ্ছে এ কায়ের বত্রিশ প্রকার অশুচি পদার্থ পর্যবেক্ষণ করা। এ অশুচি পদার্থসমূহ হচ্ছে কেশ, লোম, নখ, দন্ত, ত্বক, মাংস, স্নায়ু, অস্থি, অস্থিমজ্জা, মগজ, হৃদয়, ক্লোম, ফুস্ফুস্‌, প্লীহা, যকৃৎ, ক্ষুদ্রান্ত্র, বৃহদান্ত্র, পাকস্থলী, বৃক্ক (কিডনী), বিষ্ঠা, অশ্রু, শিকনি, থুথু, শ্লেম্মা, পিত্ত, মূত্র, রক্ত, পুয, স্বেদ(ঘর্ম), মেদ, চর্বি ও লসিকা (লালা)। এ বত্রিশটির মধ্যে প্রথম বিশটি কঠিন এবং অশ্রু থেকে শেষের বারটি তরল। এদের প্রত্যেকটি অশুভ, ঘৃণিত ও দুর্গন্ধময় রূপে পর্যবেক্ষণ বা ভাবনা করতে হয়। এ ভাবনার নাম এ কায়ের বত্রিশ প্রকার অশুচি ভাবনা, অথবা বলা যায় কায়ানুদর্শনে প্রতিকূল মনসিকার ভাবনা।
তখন সাধক বা সাধিকা বুঝতে পারেন যে এ কায়া জীবিত অবস্থায়ও অশুচি এবং মৃত অবস্থায়ও অশুচি। এরূপে তিনি নিজ কায়ের প্রতি অনাসক্ত হয়ে কায়ে কায়ানুদর্শী হয়ে অবস্থান করতে থাকেন।
এ কায় আবার চার ধাতুর সমন্বয়ে গঠিত। এ কায়ে আছে পৃথিবী (মাটি) ধাতু, অপ (জল) ধাতু, তেজ(অগ্নি) ধাতু ও বায়ু ধাতু। উপরোক্ত ৩২টির মধ্যে প্রথম বিশটি কঠিন বা পৃথিবী ধাতু। অশ্রু হতে শেষের বারটি তরল বা অপ ধাতু। নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস ও কোষ্ঠাশ্রিত বাতাস হচ্ছে বায়ু ধাতু এবং দেহের উষ্ণতাই হল তেজধাতু। এ চতুর্বিধ ধাতু ভিন্ন অন্য কিছু দেহে নেই। মনশ্চক্ষে এ দেহ বা কায়াকে এরূপ চার ধাতুতে বিভাগ করে প্রত্যবেক্ষণই চতুর্ধাতুর আকারে কায়ার বিচার। এ ভাবনার নাম কায়ের চার ধাতু ভাবনা অথবা বলা হয় কায়ানুদর্শনে ধাতু মনসিকার ভাবনা। কায়াকে এভাবে চার ধাতুতে নিরীক্ষণ করতে পারলে “আমি’ ধারণা বিলুপ্ত হয়। অর্থাৎ “এ কায়া আমি নই,” “এ কায়া আমার নহে” এবং “এ কায়া আমার আত্মা নহে-চিত্তে এ অনুভূতিটা তখন প্রকট হয়। এরূপে নিজ কায়ের প্রতি অনাসক্তি ভাব জাগ্রত হয়। এরূপে তিনি এ পঞ্চস্কন্ধের প্রতি অনাসক্ত অন্তরে অবস্থান করতে থাকেন। একায় মৃত অবস্থায় জড় পদার্থের ন্যায় পড়ে থাকে। তখন কায়ের তেজ, বায়ু ও গতিশীলতা ধ্বংস হয়। কায়ানুদর্শন ভাবনায় সাধক বা সাধিকাকে কায়ার এ অবস্থা ধ্যানের বিষয় হিসেবে গণ্য করে ভাবনা করতে হয়। মানুষ মরণশীল। এ অবস্থা প্রতিটি মানুষের জীবনে ঘটবেই। এ অবস্থা অনতিক্রম্য। মৃত ব্যক্তির দেহে তখন বিদ্যমান থাকে মাটি ও জলের অংশবিশেষ। তাও কিন্তু কিছু দিনের মধ্যে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। দু’একদিন পর মৃতদেহ ফুলে যায়, নীলাভ ও পুযপূর্ণ হয়। ধীরে ধীরে পচতে থাকে। দু”তিন দিনের মধ্যে দুর্গন্ধ বের হতে থাকে। এ পচা দেহে বিভিন্ন জীবাণুর উৎপত্তি হয়। মাংস পচে পুযপানি বের হতে থাকলে ক্রমশঃ অস্থি থেকে মাংস ঝড়ে পড়ে। এরপর দেখা যাবে শুধু কঙ্কাল। এ কঙ্কালও রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে ক্ষয় হয়ে ক্রমান্বয়ে ভেঙ্গে-চুরে যায়। তখন একস্থানে হাতের অস্থি, একস্থানে পায়ের অস্থি, কোনস্থানে বুকের অস্থি, কোনস্থানে পিঠের অস্থি, কোনস্থানে দত্ত, কিংবা কোনস্থানে মাথার খুলি এভাবে ছড়ানো ছিটানো অবস্থায় কায়ের বিভিন্ন অস্থি পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে পরে রোদ-বৃষ্টিত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। মৃতদেহের সাথে নিজদেহ তুলনা করে সাধক বা সাধিকা জ্ঞানতঃ উপলব্ধি করেন যে এ দেহ বা কায় ঈদৃশধর্মী, এর এরূপ পরিণাম অবশ্যম্ভাবী। আমার এ কায়ের অবস্থাও অবশ্যই এ রকম হবে। এ অবস্থা অনতিক্রমনীয় ৷ এরূপে তিনি নিজ কায়ের প্রতি অনাসক্ত চিত্তে কায়ে কায়ানুদরশী হয়ে অবস্থান করতে থাকেন। এ ভাবনার নাম মৃতদেহের অবস্থা ভাবনা।
🕵️‍♂️২. বেদনানুদর্শন ভাবনাঃ পঞ্চস্কন্ধের দ্বিতীয় স্বন্ধ বেদনা বা অনুভূতি। এ বেদনা কায়িক ও মানসিক উভয়বিধ হতে পারে। কায়িক ও মানসিক বেদনাকে সম্যকরূপে জানাই হচ্ছে বেদনানুদর্শন ভাবনা। সাধারণতঃ বেদনা তিন প্রকার-সুখবেদনা, দুঃখবেদনা ও উপেক্ষা বেদনা। স্মৃতিচারণের সময় সুখবেদনা অনুভব করলে ‘সুখানুভব করছি, সুখ অনুভব করছি” এবং দুঃখবেদনা অনুভব করলে “দুঃখ অনুভব করছি, দুঃখানুভব করছি” বলে ভাবনা করতে হয়। যখন সুখানুভূতি বা দুঃখানুভূতি কোনটাই থাকে না, তখন এ অনুভূতি হচ্ছে উপেক্ষা বেদনা। সামিষ (ভোগজনিত) ও নিরামিষ (বৈরাগ্যজনিত) ভেদে বেদনাকে আরও ছয় ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। সামিষ সুখ বেদনা, সামিষ দুঃখবেদনা ও সামিষ উপেক্ষা বেদনা। নিরামিষ সুখ বেদনা, নিরামিষ দুঃখ বেদনা ও নিরামিষ উপেক্ষা বেদনা। এ বেদনা কিরূপে উৎপত্তি হয়ঃ ইন্দ্রিয় ও ইন্দ্রিয়গাহ্য বস্তু বা আলম্বনের সংযোগে যে স্পর্শ হয়, এ থেকেই বেদন বা অনুভূতির উৎপত্তি হয়। চক্ষু ও রূপের সংযোগে বা স্পর্শে যে বেদনা, তা চক্ষু সংস্পর্শজ বেদনা; শ্রোত্র ও শব্দের স্পর্শে যে বেদনা, তা শ্রোত্র সংস্পর্শজ বেদনা; ঘ্রাণের সাথে গন্ধের সংযোগে ঘ্রাণ সংস্পর্শজ বেদনা, জিহ্বা ও রসের স্পর্শে জিহবা সংস্পর্শজ বেদনা, কায় সংস্পর্শজ বেদনা ইত্যাদি। প্রত্যয় বা কারণ সহযোগে এ বেদনার উৎপত্তি। তাই এ বেদনা নিত্য নয়, অনিত্য অর্থাৎ বিলয়ধর্মী বা ধ্বংসশীল। এ বেদনা উদয়-ব্যয়শীল। এ বেদনা থেকে বিবিধ তৃষ্ণার উৎপত্তি। তৃষ্ণা বস্তু বা বিষয় মাত্রই দুঃখজনক। তাই সকল প্রকার বেদনা ক্ষণস্থায়ী ও দুঃখময়। এটি উপলব্ধি করাই বেদনানুদর্শন ভাবনা। এরূপে সাধক বা সাধিকা পঞ্চস্কন্ধ বা জগতের কিছুরই প্রতি তৃষ্ণা উৎপাদন না করে অনাসক্ত হয়ে বাস করেন। এভাবে জেনে জেনে তিনি বেদনা বিষয়ে বেদনানুদশী হয়ে অবস্থান করেন।
এখানে উল্লেখ্য যে দুঃখ বেদনা কষ্টদায়ক ও দুঃখদায়ক, তা সহজে অনুমান করা যায়। কিন্তু বুদ্ধ তথাগত বলেছেন-সুখবেদনা আপাত সুখের মনে হলেও পরিণাম তার ভয়াবহ দুঃখ। কারণ সুখানুভৃতির মধ্যে লুকায়িত থাকে মহা দুঃখ। সুখের আশায় মানুষ নানা অকুশলের আশ্রয় নেয়, যার ফলে অপরিমেয় পাপ কাজ সম্পাদন করে থাকে। এ পাপকাজ পরিণামে পাপীকে মহাদুঃখের মধ্যে পতিত করে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায়-ভবিষ্যত সুখের আশায় মাতাপিতা তাদের সন্তান-সন্ততির লালন পালন করেন এবং নানা অকুশলের শরণাপন্ন হয়ে তাদেরকে বড় করে তোলেন। অনেক ক্ষেত্রে স্বীয় সন্তানেরাই মাতাপিতাকে নানাভাবে অসহনীয় দুঃখকষ্ট প্রদান করে থাকে। কোন কারণে তারা অসুস্থ হলে, কিংবা মারা গেলে, অবাধ্য হলে, অর্থ উপার্জন করতে না পারলে, মাতাপিতার ভরণ-পোষণ না করলে, অথবা কোন সম্পর্ক না রাখলে, কিংবা ঝগড়া-বিবাদ করলে, অথবা মাতাপিতাকে ভক্তি শ্রদ্ধা না করলে মাতাপিতা মনে বড় দুঃখকষ্ট পেয়ে থাকেন। এ দুঃখ-যন্ত্রণা অসহনীয়। এরূপে সন্তান-সন্ততির কারণে মাতাপিতা ইহজীবনে বহু দুঃখকষ্ট ভোগ করেন এবং পরজীবনে কৃত পাপ কাজের দরুণ কর্মানুযায়ী চার অপায় দুঃখ ভোগ করতে বাধ্য হন। সাধারণতঃ লোভ চৈতসিক থেকেই এ সুখবেদনার উৎপত্তি এবং দ্বেষ চৈতসিক থেকে এ দুঃখ বেদনার উৎপত্তি হয়। বস্তুতঃ সুখ-দুঃখহীন উপেক্ষা বেদনাই সাধক-সাধিকার একান্ত কাম্য।
🥀৩. চিত্তানুদর্শন ভাবনাঃ পঞ্চস্কন্ধের অন্যতম স্কন্ধ হচ্ছে বিজ্ঞান বা চিত্ত। এ চিত্ত সদাসর্বদা মানুষকে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত করে থাকে। এ চিত্ত কিন্তু ঘন ঘন পরিবর্তনশীল। ক্ষণে উৎপত্তি ক্ষণে বিনাশ। উৎপত্তি-স্থিতি-বিনাশ এ তিনক্ষণ হচ্ছে এক চিত্তের আয়ু। এরূপে পরিবর্তনশীল চিত্তের স্বভাব ষোল প্রকার। পরিবর্তনশীল চিত্তের এ স্বভাব বা স্বরূপ দর্শন বা জানাই হচ্ছে চিত্তানুদর্শন ভাবনা। এখন হয়তো কুশল চিত্ত, পরক্ষণে অকুশল চিত্ত। আবার হয়তো লোভ চিত্তের উৎপত্তি, পরক্ষণে অলোভ চিত্ত। পুনঃ দ্বেষ চিত্ত, পরক্ষণে অদ্বেষ চিত্ত। এরূপে মোহ চিত্ত, পরক্ষণে অমোহ চিত্ত। এভাবে সংক্ষিপ্ত, বিক্ষিপ্ত, মহদ্গত, অমহদ্গত, সমাহিত, অসমাহিত, বিমুক্ত, অবিমুক্ত ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন চিত্তের উৎপত্তি হয়। এরূপে উৎপত্তি ক্ষণে স্বনামে চিত্তকে জানতে পারলে এবং এদের উৎপত্তি-বিলয় জেনে জেনে ভাবনা করলেই চিত্তানুদর্শী হয়ে অবস্থান করা বুঝায় ৷ এতে চিত্তের প্রভাস্বরতা বিকাশ হয় এবং লোভ, দ্বেষ, মোহ, মান, দৃষ্টি প্রভৃতি চিত্তে আগন্তুক অকুশল চৈতসিক সমূহ ধীরে ধীরে বিনাশ প্রাপ্ত হয়। তখন সাধক/সাধিকা বুঝতে পারেন যে সকল প্রকার চিত্ত অনিত্য ৷ “কোন চিত্তই আমার নহে, চিত্ত আমি নই, এবং চিত্ত আমার আত্মা নহে” এরূপে স্মৃতি তার স্থিত হয়।
এখানে উল্লেখ্য যে ভাবনাময় চিত্তের অধিকারী হতে হলে চিত্তকে সেভাবে গড়ে তুলতে হয়। কিভাবে? প্রথমে পরিশুদ্ধ শীলে অধিষ্ঠিত হতে হয়। ভগবান বুদ্ধের প্রতি প্রবল শ্রদ্ধাসম্পন্ন হতে হয়। বুদ্ধের ধর্ম যে সত্যের ধর্ম, তা পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাস করতে হবে। কর্ম ও কর্মফলের প্রতি বিশ্বাস থাকতে হবে। চিত্তকে এমনিভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে চিত্ত স্মৃতি পরায়ণ হয়, বীর্যসম্পন্ন হয়, অধ্যবসায়ী হয়, লোভ-দ্বেষ-মোহহীন হয়, নিষ্পাপ ও পরিশুদ্ধশীলে অধিষ্ঠিত হতে হয়, আলস্য ত্যাগ করতে হয়। এভাবে সমস্ত প্রকার অকুশল বর্জন করে ভাবনাময় জীবনকে ধাপে ধাপে উর্ধদিকে নিয়ে যেতে হয়। সবকিছু আত্ম-চেতনার উপর নির্ভরশীল।
সাধকের চিত্ত সমাধিস্থ হলেই প্রজ্ঞার প্রাদুর্ভাব ঘটে। এ প্রজ্ঞাই হয় তখন নির্বাণের পথ প্রদর্শক। এ প্রজ্ঞাই সাধক-সাধিকাকে স্রোতাপত্তি, সকৃদাগামী, অনাগামী ও অর্হতে উন্নীত করতে সক্ষম।
🌸৪. ধর্মানুদর্শন ভাবনাঃ ধর্মের অনুদর্শন মানে ধর্মানুদর্শন। ধর্ম বলতে এখানে পঞ্চস্কন্ধের স্বভাব ধর্মকে বুঝানো হয়েছে। পঞ্চস্কন্ধের স্বভাব ধর্মের ক্ষুদ্রানুক্ষুদ্র অবস্থাকে সম্যকভাবে দর্শন করার বা জানার ভাবনাই হচ্ছে ধর্মানুদর্শন ভাবনা।সংজ্ঞা ও সংস্কার স্কন্ধ সম্পর্কে বারংবার ভাবনা করাই হচ্ছে ধর্মানুদর্শন ভাবনা। পঞ্চস্কন্ধের ছয় দ্বার-চক্ষু, কর্ণ (শ্রোত্র), নাসিকা (ঘ্রাণ), জিহ্বা, ত্বক(কায়) ও মন। দ্বার মানে দরজা। ঘরের দরজা যেমন ঘরের সাথে বাইরের যোগাযোগ রক্ষার পথ বা উপায় স্বরূপ, তেমনি পঞ্চস্কন্ধের সাথে বহির্জগতের সংযোগের মাধ্যম হচ্ছে এ ছয়দ্বার ৷ এ ছয় দ্বারকে বলা হয় ষড়েন্দ্রিয়। চক্ষু, শ্রোত্র, ঘ্রাণ, জিহবা, কায় ও মন এক একটি ইন্দ্রিয়। কেন এদেরকে ইন্দ্রিয় বলা হয়? এ ছয় দ্বার দিয়ে বহির্জগতের সাথে পঞ্চক্কন্ধের যাবতীয় কাজ সম্পাদিত হয় এবং এ ছয় ইন্দ্রিয় স্ব স্ব ক্ষেত্রে (বিষয়ে) দেবরাজ ইন্দ্রের ন্যায় পঞ্চস্কন্ধের উপর প্রভুত্ব বা ইন্দ্রত্ব করে বলেই এদেরকে ইন্দ্রিয় বলা হয়। চক্ষু, শ্রোত্র, ঘ্রাণ, জিহ্বা, কায় ও মন-এ ছয় ইন্দ্রিয়ের স্ব স্ব বিষয় (ক্ষেত্র) বা আলম্বন হচ্ছে যথাক্রমে রূপ, শব্দ, গন্ধ, রস, স্পর্শ ও ধর্ম বা ভাব। এদেরকে একত্রে দ্বাদশ আয়তন বলা হয়। চক্ষাদি ছয় ইন্দ্রিয়কে অন্তরায়তন এবং রূপাদি ছয় আলম্বনকে বহিরায়তন বলা হয়।
🧘‍♂️সংজ্ঞা হচ্ছে ষড়েন্দ্রিয়ের স্পর্শজাত প্রাথমিক জ্ঞান। কোন একটা বস্তু বা প্রাণী চোখে দেখা মাত্র যে অনুভূতি, তা হচ্ছে সংজ্ঞা। এটা হচ্ছে রূপসংজ্ঞা। কর্ণে বা শ্রোত্রে কোন শব্দ শোনা মাত্র যে অনুভূতি, তা শব্দ সংজ্ঞা। নাসিকায় বা ঘ্রাণ ইন্দ্রিয়ে কোন গন্ধ পাওয়া মাত্র যে অনুভূতি, তা গন্ধ সংজ্ঞা। জিহ্বায় কোন খাদ্য পড়া মাত্র যে অনুভূতি, তা রস সংজ্ঞা। কোন বস্তু ত্বকে ব কায়ে স্পর্শ হওয়া মাত্র যে অনুভূতি, তা স্পর্শ সংজ্ঞা। কোন চিন্তা বা ভাব মনে আসা মাত্র প্রথম যে অনুভূতি, তা ভাব সংজ্ঞা। এ সংজ্ঞার সাথে কোন হেতু যুক্ত থাকে না। হেতু মানে লোভ, দ্বেষ, মোহ, অলোভ, অদ্বেষ ও অমোহ। সংজ্ঞার সাথে এ ছয় হেতুর কোনটাই যুক্ত থাকে না। এ ছয়টির যে কোন একটা কিংবা একাধিক হেতু সংজ্ঞার সাথে যুক্ত হয়ে কর্ম সৃষ্টি করে। তখন সংস্কার সৃষ্টি হয়। সংস্কারের অপর নাম কর্ম। এই সংস্কারের কারণে তৃষ্ণার উৎপত্তি হয়, যা মানুষকে পুনর্জন্ম ধারণে বাধ্য করে। দেখা গেল সংজ্ঞার সাথে সংস্কারের ওতপ্রোত সম্পর্ক। সংজ্ঞার সাথে অকুশল হেতু (লোভ, দ্বেষ, মোহ)র যে কোনটি যুক্ত হয়ে কর্ম সম্পাদিত হলেই অকুশল সংস্কার (পাপ) গঠিত হয়। আর সংজ্ঞার সাথে কুশল হেতু (অলোভ, অদ্বেষ, অমোহ)র যে কোনটি যুক্ত হয়ে কর্ম সম্পাদিত হলে কুশল সংস্কার (পুণ্য) গঠিত হয়। এ অকুশল সংস্কার বা কুশল সংস্কার গঠন মানুষের একান্তই আত্ম-চেতনার ফলশ্রুতি।
🌺ভগবান বুদ্ধের ধর্ম হচ্ছে এই সংস্কার ধ্বংসের ধর্ম। এই সংস্কার ধ্বংসের জন্যে ভাবনা। কেননা, অকুশল সংস্কারের কারণে মৃত্যুর পর মানুষ (বা জীব) দুর্গতি ভূমিতে (তির্যক, প্রেত, অসুর ও নিরয়ে) উৎপন্ন হয়। আর কুশল সংস্কারের কারণে মৃত্যুর পর মানুষ (বা জীব) সুগতি ভূমিতে (মনুষ্য লোকে ও দেব-ব্রহ্মলোকে) উৎপন্ন হয়। সুগতি ভূমি আর দুর্গতি ভূমি যেখানেই উৎপন্ন হোক না কেন, স্বল্পকাল বা দীর্ঘকাল সুখ বা দুঃখ ভোগের পর পুনরায় সেস্থান থেকে চ্যুত হতে হয়। চ্যুত হয়ে কর্মানুযায়ী পুনঃ গতি প্রাপ্ত হয়। সংস্কারের কারণে এরূপেই জীব বা মানুষ চক্রাকারে একত্রিশ লোকভূমিতে ঘুরতে থাকে। নির্বাণ লাভ না করা পর্যন্ত এ ঘুরার শেষ নেই। তাই সংস্কার অবশ্যই পরিত্যাগ করা উচিত বা ত্যাগযোগ্য। কুশল-অকুশল উভয় সংস্কারের ধ্বংসে লাভ হয় স্রোতাপত্তি। তথাগত বুদ্ধ বলেছেন-উভয় সংস্কার মানুষকে একত্রিশ লোকভূমিতে আবদ্ধ করে রাখে। তিনি বলেছেন যে অকুশল সংস্কার হচ্ছে লৌহের শৃঙ্খল, আর কুশল সংস্কার হচ্ছে সুবর্ণ শৃঙ্খল। উভয়ই বন্ধন। ভাবনা হচ্ছে এই বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ। এ সংঙ্কারের বন্ধন থেকে কিভাবে নিজকে কিংবা নিজ চিত্তকে মুক্ত করা যায়? বুদ্ধ বলেছেন সংক্কারের এ বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে চিত্তের পঞ্চ নীরবণ ধ্বংস করা। এ পঞ্চ নীবরণ বা আবরণ চিত্তের পাচটি বন্ধন। সকল পৃথগজনের চিত্ত এ পঞ্চ নীবরণে আবদ্ধ। পঞ্চ নীবরণ হচ্ছে কামছন্দ (কামাসক্তি বা লোভ), ব্যাপাদ (ক্রোধ, হিংসা), স্ত্যানমিদ্ধ (আলস্য-জড়তা) ওদ্ধত্য-কৌকৃত্য (অহংকার, উদ্বেগ বা অস্থিরতা) ও বিচিকিৎসা (সন্দেহ)। এ বন্ধন ছেদন করতে না পারলে, কিংবা এ নীবরণ চিত্ত থেকে পরিত্যক্ত না হলে ধ্যান লাভ হয় না। ধ্যান লাভ না হলে মার্গফল লাভ কিছুতেই সম্ভব নয়। কিরূপে সাধক বা সাধিকা এ পঞ্চ নীবরণ ধর্মে ধর্মানুদশী হয়ে অবস্থান করেনঃ নিজকে নিজে জিজ্ঞেস করতে হবে, “আমার মধ্যে কামছন্দ বা লোভ আছে?” যদি থাকে, তাহলে ধ্বংসের জন্যে বলতে হবে, “বুদ্ধের প্রভাবে, ধর্মের প্রভাবে, সংঘের প্রভাবে, আমার শীলের প্রভাবে, আটাশ বুদ্ধের প্রভাবে, অহর্ৎ ভিক্ষু-ভিক্ষণীদের প্রভাবে এবং সকল দেবগণের প্রভাবে আমার চিত্তের লোভ বা কামবাসনা বিনাশ হোক, বিনাশ হোক, বিনাশ হোক। এভাবে মনে মনে প্রতিনিয়ত বলতে থাকলে চিত্তের লোভ বা কামভাব ধ্বংস হতে বাধ্য। তখন তিনি লোভ বা কামাসক্তি ত্যাগ করে লোভহীন ও আসক্তিহীন হয়ে অবস্থান করেন। এরূপে প্রতিটি নীবরণ নাম ধরে ধরে উল্লিখিত পন্থায় ধ্বংস করতে হয়। তখন তিনি দ্বেষ (হিংসা) ত্যাগ করে বিদ্বেষহীন মন নিয়ে সর্বপ্রাণীর প্রতি অনুকম্পা পরায়ণ হন। দেহ-মনের আলস্য জড়তা ত্যাগ করে নিরলস ও স্মৃতিমান সম্প্রজ্ঞ হয়ে থাকেন। মনের্রর অহংকার, উদ্বেগ, উৎকন্ঠা পরিহার করে অনুদ্ধত, অনুদ্ধিগ্ন ও শান্ত চিত্ত হন। এরপর চিত্তের সংশয় বা সন্দেহ বিনোদন করে অসংশয়ী ও নিঃসন্দিগ্ধ হন এবং সংশয় থেকে চিত্তকে শুদ্ধ করে কুশল কর্মের প্রতি এগিয়ে যান। এভাবে তিনি চিত্তদোষক পঞ্চ নীবরণ বা অন্তর প্রতিবন্ধক ধর্মসমূহ অতিক্রম করে কামনা-বাসনা কিংবা কুপ্রবৃত্তির কবল থেকে মুক্ত হয়ে ক্রমান্বয়ে ধ্যানে উত্তরোত্তর স্তর লাভ করতে সক্ষম হন। এরূপে সাধক বা সাধিকা পঞ্চ নীবরণ ধর্মে প্রকৃত ধর্মানুদর্শী হয়ে অবস্থান করেন।
🌷সংস্কার সৃষ্টির প্রধান ও অন্যতম উৎস এ দ্বাদশ আয়তনকে প্রকৃষ্ট রূপে জানা আবশ্যক। চক্ষু ও রূপ, শ্রোত্র ও শব্দ, ঘ্বাণ ও গন্ধ, জিহবা ও রস, কায় (তক) ও স্পর্শ, মন ও ধর্ম বা ভাব – এ সবের পরস্পর সংযোগে চিত্তে যাতে কোন আসক্তি উৎপন্ন না হয়, লোভ-দ্বেষ বা ক্রোধ-হিংসা দ্বারা চিত্ত কলুষিত না হয়, সেদিকে সকল সাধক-সাধিকাকে সর্বক্ষণ কড়া দৃষ্টি রাখতে হয়। এরূপে সাধক বা সাধিকা দ্বাদশ আয়তন ধর্মে (বিষয়ে) সম্যক ধর্মানুদর্শী হয়ে অবস্থান করেন। তিনি জগতের বা পঞ্চঙ্কন্ধের কিছুরই প্রতি আসক্তি উৎপাদন না করে অনাসক্ত হয়ে জীবন যাপন করেন।
🌹পঞ্চস্কন্ধের প্রতিটি স্কন্ধ রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান সম্পর্কে উপরোক্ত উপায়ে স্মৃতি ভাবনায় বুঝা গেল যে এর প্রতিটি স্কন্ধ উদয়-ব্যয়শীল, উৎপত্তি-বিনাশশীল। অতএব, পঞ্চস্কন্ধের ভাবনা কিরূপে ভাবতে হয় – তিনি প্রকৃত জানেন এবং সম্যকভাবে ভাবেন যে এটি রূপ, এভাবেই রূপের উদয় এবং এভাবেই রূপের অস্তগমন। এটি বেদনা, এভাবেই বেদনার উৎপত্তি এবং এভাবেই বেদনার অস্তগমন ৷ এটি সংজ্ঞা, এরূপেই সংজ্ঞার উৎপত্তি এবং এরূপেই সংজ্ঞার বিলয় হয়। এটি সংস্কার, এরূপেই সংস্কারের উদয় হয় এবং এরূপেই সংস্কারের বিলয় হয়। এটি বিজ্ঞান (চিত্ত), এ বিজ্ঞানের এরূপে উৎপত্তি এবং এরূপে বিনাশ | এভাবে পঞ্চস্কন্ধের সবকিছু উদয়-ব্যয়শীল, ক্ষয়শীল, ধ্বংসশীল ও অনিত্য; অনিত্য বলেই সব সময় হারিয়ে যাবার ভয়, তাই দুঃখপূর্ণ। এ পঞ্চস্কন্ধ আহার নির্ভরশীল। আহার বিনা এ পঞ্চঙ্কন্ধের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাই এটি আহার-সাপেক্ষ বলেই অসার বা অনাত্ম। সুতরাং এ পঞ্চস্কদ্ধ অনিত্য, দুঃখপূর্ণ ও অনাত্ম। এ পঞ্চস্কন্ধ আমিও নই, আমারও নহে এবং আমার আত্মাও নহে। এরূপে সাধক বা সাধিকা পঞ্চস্কন্ধে অনাসক্তি উৎপন্ন করে এর স্বভাব ধর্মে সম্যকভাবে ধর্মানুদর্শা হয়ে অবস্থান করেন। এ চতুর্বিধ স্মৃতিপ্রস্থান ভাবনায় কায়ানুদর্শনে রুপস্কন্ধের শুভে অশুভ জ্ঞান, বেদনানুদর্শনে সুখে দুঃখ জ্ঞান, চিত্তানুদর্শনে চিত্তের নিত্যতায় অনিত্য জ্ঞান এবং ধর্মানুদর্শনে আত্মা ধারণায় অনাত্ম জ্ঞানের বিকাশ হয়। উপরোক্ত উপায়ে পঞ্চস্কন্ধে ভাবিত সাধক বা সাধিকা শীলে বিশুদ্ধ হয়, তার চিত্ত পরিশুদ্ধ হয় এবং সাথে সাথে দৃষ্টিও পরিশুদ্ধ হতে থাকে। দৃষ্টি মানে মিথ্যাদৃষ্টি বা মিথ্যা জ্ঞান। সাধককে অবশ্যই সর্বতোভাবে মিথ্যাদৃষ্টি পরিহার করতে হয়। মিথ্যাদৃষ্টির ধ্বংসে চিত্তে সত্যজ্ঞান বা প্রজ্ঞার উদ্ভব হয়। শীলবিশুদ্ধি, চিত্তবিশুদ্ধি ও দৃষ্টিবিশুদ্ধি বা জ্ঞানবিশুদ্ধি – এ তিন বিশুদ্ধি বিদর্শন ভাবনার জন্যে একান্ত প্রয়োজন। এসব বিশুদ্ধি ভাবনার ভিত্তি স্বরূপ। এদেরকে বিদর্শন কর্মস্থান বা ধ্যান-বিষয় বলা হয়। কিরূপে এদের ভাবনা অনুশীলন করতে হয় ? নিজকে নিজে জিজ্ঞেস করতে হয়, “আমি কি শীলে পরিশুদ্ধ আমার চিত্ত কি সর্ব আসক্তি মুক্ত ? আমার দৃষ্টি বা জ্ঞান পরিশুদ্ধ কি না?” যদি পরিশুদ্ধ না হয়ে থাকে, তাহলে বিশুদ্ধির জন্যে প্রবল প্রচেষ্টা চালাতে হয়। বারংবার একটি একটি করে জিজ্ঞাসার মাধ্যমে নিজকে পরিশুদ্ধ করতে হয়। এরপে স্বৃতি ভাবনা করতে করতে পঞ্চস্কন্ধের বিলক্ষণ জ্ঞান অনিত্য, দুঃখ, অনাত্ম সাধকের চিত্তে প্রকট হতে থাকে। তখন সাধক উপলব্ধি করতে পারেন যে বারে বারে এই অনিত্য ও অনাত্মময় দেহ ধারণ করা মানে দুঃখ-যন্ত্রণার সম্মুখীন হওয়া। তখন এ পঞ্চস্কন্ধ ধারণের প্রত সাধকের ঘৃণাবোধ জাগ্রত হয় এবং এ পঞ্চস্কন্ধ যাতে আর ধারণ করতে না হয়, সেজন্যে তিনি বিমুক্তি প্রত্যাশী হন। ক্রমে ক্রমে ভাবনা গভীর হতে গভীরতর হলে তার চিত্ত সমাধিস্থ হয় এবং ভাবনার এক পর্যায়ে তিনি স্রোতাপত্তি ফলে অধিষ্ঠিত হন। তখন দশ সংযোজনের অধোভাগীয় প্রথম তিন সংযোজন সংকায় দৃষ্টি, বিচিকিৎসা ও শীলব্রত পরামর্শ তার বিসর্জিত হয়। দুঃখ সত্য অতিশয় স্পষ্ট হয় এবং অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুশীলিত হয়। সাথে সাথে নির্বাণের উপলব্ধি হয়। সাধক নির্বাণের স্রোতে পতিত হন বলেই তাকে স্রোতাপন্ন বলা হয়। চার অপায় দ্বার অর্থাৎ তির্যক, প্রেত, অসুর ও নিরয়ে উৎপত্তি তার চিরতরে রুদ্ধ হয়। তাকে আর কিছুই ঠেকাতে পারবে না, তিনি অবশ্যই নির্বাণ অধিগত করতে সক্ষম। কিন্তু স্রোতাপত্তি লাভের পর যদি কোন কারণে তার মৃত্যু হয়, তবে অনুরোর্ধ সাতজন্ম ধারণ করে তিনি নির্বাণ প্রাপ্ত হন।দ স্রোতাপত্তি এটি প্রথম লোকোত্তর চিত্তের উৎপত্তি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও বুঝবার বা জানবার কোন উপায় নেই।
💐লোকোত্তর চিত্তের ক্রমোন্নতির অবস্থা চারটি। যথা -১. স্রোতাপন্নের চিত্ত, ২. সকৃদাগামীর চিত্ত, ৩. অনাগামীর চিত্ত ও ৪. অর্হতের চিত্ত। অন্য তিনটি চিত্তও স্রোতাপন্নের চিত্তের একই নিয়মে উৎপন্ন হয়। তবে এসব চিত্ত ক্রমান্বয়ে আরও বিশুদ্ধতা প্রাপ্ত হয়, এই মাত্র পার্থক্য। স্রোতাপত্তি লাভের পর সাধকের চিত্ত ক্রমান্বয়ে আরো শ্রদ্ধাসম্পন্ন, বীর্ষবান, স্মৃতিমান, সমাধি্রর পরায়ণ ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন হয়। সাধক তার দৈনন্দিনের ভাবনায় শ্রদ্ধা, বীর্য, স্মৃতি, সমাধি ও প্রজ্ঞা- ইন্দ্রিয়কে আরো বলবতী করেন এবং এদের সহায়তায় উচ্চতর ভাবনার দিকে অগ্রসর হন। দুঃখসত্যকে বার বার হৃদয়ঙ্গমের ফলে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের ঘন ঘন অনুশীলন চলতে থাকে। সাথে সাথে সপ্ত বোধ্যঙ্গ – স্মৃতি, ধর্মবিচয় (প্রজ্ঞা), বীর্য, প্রীতি, প্রশ্রদ্ধি, সমাধি ও উপেক্ষা ধাপে ধাপে ভাবিত হয়ে থাকে। এ সাতটি সম্বোধি বা বোধিলাভের অঙ্গ। এর ফলে চিত্ত ক্রমশঃ পরিশুদ্ধির দিকে এগিয়ে যায়। ভাবনার ক্রমোর্ধ্ব গতিতে ধাপে ধাপে লাভ হয় সকৃদাগামী, অনাগামী ও অরহত্ব। দশ সংযোজনের অধোভাগীয় কামরাগ ও ব্যাপাদ (হিংসা) দু’টো ক্ষীণ হলে সকৃদাগামী, সম্পূর্ণ বিনাশে অনাগামী এবং রূপরাগ, অরূপরাগ, মান, ওঁদ্ধত্য ও অবিদ্যা-এ পীচটি উর্ধভাগীয় সংযোজন ধ্বংস হলে অর্হত্ লাভ হয়। সকৃদাগামী লাভ করে মৃত্যু হলে পুনঃ একবার মাত্র মানবকুলে জন গ্রহণ করে ধ্যানের মাধ্যমে নির্বাণ প্রান্ত হন। অনাগামী প্রাপ্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করলে শুদ্ধাবাস ব্রহ্মলোকে উৎপন্ন হন এবং সেস্থান থেকেই নির্বাণ লাভ করেন। আর যিনি ইহজীবনে অর্হত্‌ প্রাপ্ত হন, তিনি এখান থেকে পরিনির্বাপিত হয়ে নির্বাণ লাভ করেন। অর্হত হচ্ছে নির্বাণ অধিগমের সর্বোত্তম স্তর
☘️যিনি পঞ্চস্কন্ধের পুনরোৎপত্তির সকল হেতু ধ্বংস করেছেন, সকল ক্লেশ অরি (শক্র) হত বা পরাস্ত করেছেন, তিনিই অহর্ৎ নামে খ্যাত হন। অর্হতের সকল করণীয় সমাপ্ত, লোক পরিক্রমা পরিসমাপ্ত এবং জন্ম চিরতরে রুদ্ধ। লোভ-দ্বেষ-মোহ আর কোন সময় অরহতে অন্তরে উদ্ভব হয় না। অবিদ্যা ও তৃষ্ণার নিরবশেষ অবসানে তিনি হন পরিপূর্ণ বিমুক্ত, নির্বাণ শান্তি-সুখে স্নাত এবং তিনি জন্ম-মৃত্যুর অতীত। তিনি হচ্ছেন মহাক্ষীণাসব, পঞ্চস্কদ্ধ ভারমুক্ত এবং নির্বাণগত সুদুর্লভ আর্য পুদ্গল। এই প্রাপ্তি বিদর্শন ভাবনা বা নির্বাণ সাধনার মুখ্য উদ্দেশ্য।
স্মৃতিঃ স্মৃতি মানে স্মরণ করা বা জপনা করা। এটা চিত্ত ক্রিয়া। কুশল আলম্বন স্মরণ করাই হচ্ছে স্মৃতি। অকুশল বিষয় স্বরণ করা স্মৃতি নহে, এটি অকুশল চিত্তোৎপত্তি। শারীরিক ও মানসিক কর্ম-ক্রিয়া যখন যা ঘটে, তখন তাকে চিত্তের সাহায্যে সম্যকভাবে স্মরণ করা বা জানাই হচ্ছে স্মৃতি। চক্ষু দ্বারা রূপ দেখা হয়, “দেখছি,” বলে সম্যকভাবে জানাই স্মৃতি। সেরূপ শ্রোত্র দ্বারা শব্দ শোনা হয়, “শুনছি” বলে সম্যকভাবে জানাই স্মৃতি। ঘ্রাণ ইন্দ্রিয় দ্বারা গন্ধ গ্রহণ করা হয়, ‘গন্ধ পাচ্ছি” বলে জানাই স্মৃতি। জিহ্বা দ্বারা রস আস্বাদন করা হয়, “আস্বাদ লাগছে” বা “বিস্বাদ লাগছে” বলে জানাই স্মৃতি। কায় দ্বারা স্পর্শ করা হয়, ‘স্পর্শ করছি” বলে জানাই স্মৃতি। মন দ্বারা ধর্ম মনন করা হয়, “মনন করছি” বা “চিন্তা করছি” বলে জানাই স্মৃতি। স্মৃতির পুনঃ পুনঃ অনুশীলনই ভাবনা। যেমন-দেখলে “দেখছি, দেখছি, দেখছি” অথবা শুনলে “শুনছি, শুনছি, শুনছি” বলে বারংবার স্মৃতি করাকে স্মৃতির অনুশীলন বা ভাবনা বলা হয়।
🙏মূলতঃ কায়, বেদনা, চিত্ত ও ধর্ম-এ চতুর্বিধ আলম্বনের যথাযথ স্বভাবে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকাই হচ্ছে স্মৃতি। স্মৃতির কাজ হল এদের অশুভ দর্শন এবং অনিত্য-দুঃখ-অনাত্ম লক্ষণ উপস্থিত করা। কায় অশুভ, বেদনা দুঃখময়ী, চিত্ত অনিত্য এবং ধর্মসমূহ অনাত্ম। তাদের স্ব স্ব লক্ষণ সম্যকভাবে জানাই হচ্ছে স্বৃতি। স্মৃতি প্রমাদ ধ্বংস করে, অপ্রমাদ গঠন করে। সর্বোপরি স্মৃতি চার মার্গজ্ঞান উৎপাদনের প্রধান অঙ্গ। অবিচ্ছেদ্যভাবে স্মৃতি করাকে কিংবা স্মৃতির্রর ধারাবাহিকতাকে বলা হয় স্মৃতি সম্প্রজ্ঞান। দাড়ানে, গমনে, উপবেশনে ও শয়নে-এ চার ঈর্যাপথে যখন যা দৃষ্ট, শ্রুত ও অনুভূত হয়, তখন সে অবস্থার প্রতি পূর্ণ মনযোগী থাকাই হচ্ছে স্মৃতি সম্প্রজ্ঞানের অনুশীলন বা স্মৃতি ভাবনা।
স্মৃতি সাধনের বৈশিষ্ট্যঃ
১. বিদর্শন স্মৃতি সর্বদা জ্ঞান সম্প্রযুক্ত কুশল চিত্ত উৎপন্ন করে। স্মৃতি কুশল অবস্থাকে সর্বদা জাগত রাখে, অকুশল অবস্থা সৃষ্টিতে বাধা প্রদান করে। স্মৃতি সাধককে সেবিতব্য ধর্ম সেবনে সাহার্য করে এবং অসেবিতব্য বিষয় পরিত্যাগে বাধ্য করে। এজন্যে বুদ্ধ বলেছেন, “সতিং চ খ্বাহং ভিক্খবে সব্বথিকং বদামি |” হে ভিক্ষুগণ, স্মৃতিকেই আমি সবার্থ সাধিকা বলে থাকি অর্থাৎ সর্ববিধ কুশল উদ্দেশ্য সিদ্ধিদাত্রী বলে থাকি।
২. স্মৃতি অতীত ও অনাগতের সম্পর্ক নিয়ে ব্যস্ত নহে। স্মৃতি শুধু বর্তমানকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে। যে ক্ষণে যে মুহুর্তে যে দ্বারে যে আলম্বনের সংযোগ ঘটে, সে ক্ষণে সে মূহুর্তে সে দ্বারে সে আলম্বনের “সংযোগ হয়েছে” বলে জানাই (বর্তমান) স্মৃতি। এভাবে সংশ্লিষ্ট দ্বার ও্র আলম্বনের ক্রিয়ার অনুদর্শনই বিদর্শন। এরূপ অনুদর্শনের দ্বারা নামরূপের যথাযথ স্বভাব প্রতিফলিত হয়। যে ক্ষণে যে আলম্বন গৃহীত হয়েছিল, সে ক্ষণ অতীত হয়ে গেলে সাথে সাথে সে আলম্বনও লুপ্ত হয়ে যায়। সুতরাং লুপ্ত আলম্বনের অনুসরণ করলে কোন ফলোদয় হয় না, বরং তাতে চিত্ত বিক্ষিপ্ত হয়। অতএব, অতীত আলম্বনকে বিসর্জন দিয়ে বর্তমান ক্ষণে উৎপন্ন আলম্বনের স্থিতি ও ভঙ্গ লক্ষণের প্রতি চিত্তকে সমাহিত রাখা কর্তব্য; অতীত আলম্বন যতই মধুর ও সুখাবহ হোক না কেন।
৩. অনাগত আলম্বনের জন্যেও উৎকন্ঠিত বা আকাঙ্খিত হওয়া অনুচিত। অনাগত আলম্বন কিরূপ হবে, তাই ভেবে চিত্ত বিকম্পিত হয়। সুতরাং অনাগত বিষয় হতে চিত্তকে সর্বদা মুক্ত রাখা কর্তব্য। কেননা এতে নামরূপের স্বরূপ উদ্ঘাটিত হয় না। অপ্রত্যক্ষ বিষয়ের পূর্ব ধারণা করা সঠিক নয়।
৪. মনে রাখতে হবে বিদর্শন স্মৃতি কল্পিত নহে, প্রত্যক্ষ। এতে কল্পনা বা চিন্তার কোন স্থান নেই। কল্পনা, চিন্তা বা শ্রুতময় জ্ঞান দ্বারা পরমার্থ সত্যের সন্ধান পাওয়া যায় না। ভাবনাময় জ্ঞান দ্বারা পরমার্থ সত্যের দ্বার উদ্ঘাটিত হয়। বিদর্শন স্মৃতি ভাবনাময় জ্ঞান। উপমার সাহায্যে বিষয়টা আরও পরিষ্কার হবে। একটি বক মাছ ধরার আশায় এক সরোবরের তীরে গাছের ওপর বসে আছে। মাছ নড়া মাত্রই সে ছো মেরে মাছ ধরে এবং খায়। মাছ নড়ার পূর্বে কিংবা কিছুক্ষণ পরে ছো মেরে মাছ ধরতে গেলে বকের মাছ ধরা হবে না। তদ্রুপ সাধককে বকের ন্যায় সতত স্মৃতি পরায়ণ থাকতে হয়। যখন যে দ্বারে আলম্বন পতিত হয়, তখনই তিনি তা গ্রহণ করে স্মৃতি্রর সংমর্শন করেন। মাকড়সার ন্যায় সাধককে স্মৃতি জাল বিস্তার করে সর্বক্ষণ পাহাড়ায় থাকতে হয়। স্মৃতি জালে যখন যা ধৃত হয়, তখনই তাকে তৎভাবে গ্রহণ করতে হয়। দ্বার একাধিক্রর হলেও গ্রহণকারী চিত্ত কিন্তু একটা। যখন যে দ্বারে আঘাত প্রবল হয়, সে দ্বারে চিত্ত গিয়ে উপস্থিত হয় এবং আপন কার্য সমাধা করে তার নিদিষ্ট স্থানে হৃদয়-বাস্তুতে অবস্থান করে।
তথাগত সম্যক সম্বৃদ্ধ দেশনা করেছেন,-জগতে পাচ প্রকার নিয়ম বা স্বাভাবিক রীতি প্রচলিত আছে। যথা-বীজ নিয়ম, খতু নিয়ম, কর্ম নিয়ম, ধর্ম নিয়ম ও চিত্ত নিয়ম।
ক. বীজ নিয়মঃ বীজ তার স্ব স্ব ধর্মতা বা স্বভাব অনুসারে যথাসময়ে স্বকীয় ফল-পুষ্প প্রদান করে। যেমন ধান্যের বীজ থেকে ধান্যই উৎপন্ন হয়। এটি বীজ নিয়ম।
খ. ঋতু নিয়মঃ ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে ভিন্ন ভিন্ন ফসল উৎপন্ন হয়, গাছে গাছে ফুল ফুটে ও ফল ধরে। আবহাওয়ার পরিবর্তন সূচিত হয়। ফলে শীত, গ্রীম্ম, বর্ষা ইত্যাদি ঋতুর পরিবর্তন হয়। এটি ঋতু নিয়ম।
গ. কর্ম নিয়মঃ প্রতিটি মানুষ বা জীব তার কৃত কর্ম অনুসারে ফলভোগ করে। কুশল কর্মের ফল কুশল বা ভাল, যার ফলে মনুষ্যলোকে, দেবলোকে কিংবা ব্রক্ষলোকে উৎপন্ন হওয়া যায়। আর অকুশল কর্মের ফল অকুশল বা মন্দ, যার ফলে তির্যক, প্রেত, অসুর ও নিরয় এ চার অপায়ে উৎপন্ন হয়ে অপরিমেয় দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে হয়। এটি কর্ম নিয়ম, যা কারও প্রদত্ত পুরস্কারও নয় কিংবা শাস্তিও নয়। চন্দ্র-সূর্য যেমনি স্ব স্ব প্রাকৃতিক নিয়ম অনুসারে কার্যকর, তেমনি কর্মফলও একান্তই কর্মের সহজাত নিয়মে কার্যকর।
ঘ. ধর্ম নিয়মঃ বোধিসত্ত্বের মাতৃগর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণ করার সময় দশ সহস্র চক্রবাল কম্পিত হয়, এটি ধর্ম নিয়ম অর্থাৎ ধর্মতঃ যা ঘটে, যেমন মাধ্যাকর্ষণ।
ঙ. চিত্ত নিয়মঃ রূপাদি আলম্বন (রূপ, শব্দ, গন্ধ, রস, স্পর্শ ইত্যাদি) চক্ষাদি ইন্দ্রিয় সমূহে চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহবা, ত্বক) সংঘর্ষিত হলে চিত্তের নিয়ম অনুসারে চিত্তে চেতনা উৎপন্ন হয়। ভবাঙ্গ চিত্তে সৃষ্ট এ চেতনা আবর্তন চিত্ত, এরপর সম্প্রতীচ্ছ চিত্ত, সন্তীরণ চিত্ত, ব্যবস্থাপন চিত্ত, সপ্তজবন চিত্ত, তদালম্বন চিত্ত ইত্যাদিতে রূপান্তরিত হয়। তখন “আবর্তন চিত্ত উৎপন্ন হও” অথবা “জবন চিত্ত উৎপন্ন হও” বলে চিত্ত উৎপাদন করবার কোন কর্তা নেই। অথচ আলম্বনের সাথে ইন্দ্রিয়ের সংস্পর্শ হলেই তাদের নিজ নিজ ধর্মানুসারে ভিন্ন ভিন্ন চিত্ত উৎপন্ন হয়ে থাকে। এটি চিত্ত নিয়ম। এ সব বিশ্বজনীন নীতি।
চিত্ত নিয়মের অনুধাবন করাই স্মৃতি সাধনা বা স্মৃতি ভাবনা। দ্বার নির্বাচন হচ্ছে চিত্তের প্রধান কাজ। দ্বার বলতে চক্ষুদ্বার, শ্রোত্রদ্বার, ঘ্রাণদ্বার, জিহবাদ্বার, কায়দ্বার ও মনদ্বারকে বুঝায়। যে দ্বারের কাজ তীব্রতর, তারই স্বৃতি সংরক্ষণ করতে হয়। যেমন-কোন বস্তু দৃষ্টি পথে পতিত হলে “দেখছি বলে স্মৃতি রক্ষা করতে হয়। এমন সময় বিকট মেঘ-গর্জনের শব্দ হল, ঠিক সে মূহুর্তে পূর্ব আলম্বন “দেখছি” পরিত্যাগ করে শুনছি শুনছি” বলে স্মৃতি করতে হয়। আবার যখনই ফুলের গন্ধে মন আকৃষ্ট হল, তখনই শব্দ আলম্বন পরিত্যাগ করে গন্ধ আলম্বনে স্মৃতি স্থাপন করতে হয়। এভাবে দ্বার নির্বাচনে দক্ষতা অর্জন করতে না পারলে স্মৃতি সাধনে সুফল পাওয়া যায় না। তবে কি বস্তু দেখছি, কিসের শব্দ শুনছি, কিংবা কিসের গন্ধ পাচ্ছি বলে নাম ধরে বিচার করতে হয় না। বিচার করলে সত্ত্ব সংজ্ঞার অপনোদন হয় না। দ্বারালম্বন মাত্রই রূপ। এ পারমার্থিক শব্দের প্রয়োগ করে সর্ববস্তুতে “রূপ” “কূপ” এ জ্ঞানে স্মৃতি সাধন করতে হয়। এভাবে স্মৃতি-সাধনা বা ভাবনা করলে মনুষ্য, পশু, পাখি, বৃক্ষ, লতা প্রভৃতি জীবজন্তু বা পদার্থ সমূহের শ্রেণীভেদ পরিত্যক্ত হয় এবং নামরূপের স্বরূপ পরিস্ফুট হয়ে উঠে।
৫. স্মৃতি ভাবনার সবচেয়ে সেরা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রজ্ঞার বিকাশ। প্রজ্ঞাহীন ব্যক্তির ধ্যান লাভ হয় না, ধ্যান না করলে প্রজ্ঞা উৎপন্ন হয় না। যার ধ্যান ও প্রজ্ঞা উভয়ই আছে, তিনিই নির্বাণের সমীপে অবস্থান করেন অর্থাৎ নির্বাণ লাভ করতে পারেন। একাগ্র মনে স্মৃতি-সাধনা করে প্রজ্ঞা বিকশিত করতে হয়। স্মৃতি যতই তীব্রতর হয়, ততই প্রজ্ঞার বিকাশ হয়। প্রজ্ঞা হচ্ছে জগতের তত্তববিষয়ক বিষয়ের প্রতি যথাযথ দর্শন। প্রজ্ঞা অবিদ্যার অন্ধকার বিনাশ করে, বিদ্যালোক উৎপন্ন করে। এ বিদ্যালোক চার আর্যসত্য প্রকাশিত করে এবং পঞ্চঙ্কন্ধে অনিত্য-দুঃখ-অনাত্ম জ্ঞান প্রদর্শন করে। কৃষক যেমন এক হাতে ধান্যাদি ধারণ করে অপর হাতে কাস্তে দ্বারা তা ছেদন করেন, সেরূপ সাধক প্রজ্ঞারূপ কাস্তে দ্বারা তৃষ্ণা ছেদন করেন। তৃষ্ণার অভাবে জন্ম-মৃত্যু রুদ্ধ হয়। জনা-মৃত্যুর ধ্বংসে দুঃখের পরিপূর্ণ অবসান সম্ভব এবং পরম শান্তি নির্বাণ লাভও সম্ভব।
কিছুদিন স্মৃতি করার পর মন কিছুটা স্থির হলে মুল স্মৃতিতে অর্থাৎ ফুলা-কমায় চলে যান। পেট ফুললে “ফুলছে” এবং কমলে “কমছে’ বারংবার বলতে থাকুন। এভাবে করার পর সত্যিসত্যিই স্মৃতি আসলে বিবিধ নিমিত্ত দেখতে পাবেন। দেখলে “দেখছি, দেখছি বলে বার বার জানুন। শুনলে “শুনছি, শুনছি” বলে জানতে থাকুন। এরূপে যখন যা ঘটে, তখন তা ঘটছে বলে জানুন। যেমন মন চিন্তা করলে “চিন্তা করছে” বলে জানুন এবং পরিকল্পনা করলে “পরিকল্পনা করছে” বলে জানুন। এই জানাটা হচ্ছে ধ্যান। এর ফলে মনটা আর অন্য কোন দিকে যেতে পারবে না। একটি বিষয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়বে। মনে লোভ উৎপন্ন হলে “লোভ আসছে’, হিংসা উৎপন্ন হলে হিংসা আসছে” রাগ আসলে ‘রাগ আসছে”, সুখ আসলে “সুখ” এবং দুঃখ আসলে “দুঃখ, দুঃখ” বলে জানতে থাকুন।
এভাবে নিজের মধ্যে নিজে যখন আত্মমগ্ন হয়ে যাবেন, তখন আপনার মধ্যে আর কোন টেনশন থাকতে পারে না। চিত্তে লোভ উৎপন্ন হয়েছে বলে জানতে পারলে লোভ আর থাকতে পারে না। সেরূপ রাগ আসলে রাগ বলে জানতে পারলে রাগ আর থাকতে পারে না। তদ্রুপ চিত্তে হিংসা উৎপন্ন হয়েছে বলে জানতে পারলে হিংসা চলে যেতে বাধ্য। এরূপে একে একে চিত্তের যাবতীয় আসক্তির অবসান হলে চিত্ত পরিশুদ্ধ হয়ে উঠবে। পরিশুদ্ধ চিত্তে আপনি যখন পঞ্চস্কন্ধের লক্ষণত্রয়-অনিত্য, দুঃখ, অনাত্ম পারমার্থিকভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন, তখন যাবতীয় সংস্কারের ধ্বংসে আপনি হবেন প্রোতাপন্ন অর্থাৎ আপনি নির্বাণ স্রোতে পতিত হবেন। সেই স্রোত আপনাকে অবশ্যই জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুহীন স্থানে অর্থাৎ চির শান্তিময় নির্বাণে নিয়ে যাবেই।

সম্মন্ধে SNEHASHIS Priya Barua

এটা ও দেখতে পারেন

মেডিটেশান এবং আপনার ব্রেইন

Leave a Reply