ব্রেকিং নিউজ

🕵️‍♂️সংক্ষেপে বিদর্শন ভাবনা পদ্ধতি ২য় পর্বঃ 🖋

তৃতীয় বিদর্শন (সংমর্শন জ্ঞান) সমাধি যখন বলবৎ হয় তখন অনেক অপ্রীতিকর অনুভূতির অভিজ্ঞতা লাভ করেন যেমন চুলকানী, উষনতা, বেদনা ভারাক্রান্ত ভাব, অদ্ভুত অনুভূতি যেন দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাধা হয়েছে অথবা তাকে অতি ছোট গর্তের মধ্যে রাখা হয়েছে। যা হোক যখন তারা বিদর্শন ভাবনা স্থগিত রাখেন তখন এ অপ্রীতিকর অনুভূতি অদৃশ্য হয়। যখন বিদর্শন ভাবনা আবার চালিয়ে যান তখন সে সব অনুভূতি আবার উপস্থিত হয়। এসব অনুভূতি সম্পর্কে চিন্তার কোন কারণ নাই। বিদর্শনের তৃতীয় স্তরে যখন পৌছেন তখন সাধারণত এসব অপ্রীতিকর অনুভূতি উপস্থিত হয়। যদি এগুলির প্রতি মনোনিবেশ করেন তাহলে বলুন “চুলকাচ্ছে’, “চুলকাচ্ছে’ বা যন্ত্রণা বোধ হচ্ছে অথবা অন্য যেকোন অনুভূতি উপস্থিত হউক না কেন সে নামেই বারবার ডাকতে হবে। এর ফলে এ অপ্রীতিকর অনুভূতিগুলি আবার দূরীভূত হবে। এরকম আরও কতগুলি অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পাবেন যেমন বুদ্ধের শিষ্যসহ আকাশে বিচরণ, প্রিয় ও শ্রদ্ধাভাজন লোকজন, বন, পর্বত, মানুষ, কঙ্কাল, জীবজন্ত প্রাণির ভগ্নরূপ, অচেতন পদার্থ নরকের ঘৃণিত জীব, দেবতা ইত্যাদি। তিনি আরও অনুভব করতে পারেন যে নিজেকে রক্তপাত বা ছ্বিখপ্তিত অবস্থায় বা পচাগলা অবস্থায় দেখছেন। তিনি প্রকৃতপক্ষে নিজের হাড় মাংসপেশী, অন্তর প্রভৃতি দৃশ্য যেন দেখতে পাচ্ছেন এ অনুভূতিও লাভ করতে পারেন। এগুলি কেবল কল্পিত জিনিস হয়। বিদর্শনের সেই স্তরে সমাধি এত উন্নত হয় যে কোন কিছু কল্পনা করা মাত্রই তা হঠাৎ যেন উপস্থিত হয়। যখন এগুলি উপস্থিত হয় তখন সচেতন থাকবেন এবং বলুন “দেখছি’ “দেখছি’। যা হোক এসব অদ্ভুত দৃশ্যে যদি মনোযোগী হন অথবা এ দৃশ্যগুলি দেখার পর ভয়ের সাথে যদি এগুলি অতিক্রম করেন এগুলি শীঘ্রই অদৃশ্য হবেনা। অন্যথায় “দেখছি’ ‘দেখছি’ এরূপ একবার বা দুইবার বলার পর এগুলি অদৃশ্য হবে। এই স্তরে যত্ববান হওয়া উচিত যে ধারণাগুলি যেন তার একাগ্রতাকে বিশৃঙ্খল না করে।
কোন কোন এ রকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন না এবং উঠা, বসা, পড়া বা স্পর্শ করা এ চার উপাদানের উপর অনেকক্ষণ ধরে একাগ্রচিত্ত হওয়ার পর ক্লান্ত হয়ে পড়বেন। তখন তাদের এভাবে সচেতন হয়ে ‘ক্লান্ত বোধ করছি’ ক্লান্ত বোধ করছি’ বলতে হবে যতক্ষণ না পর্যন্ত এভাব অদৃশ্য হয়।
✍️যখন বিদর্শনের এই স্তরে পৌছেন তার একাগ্রতায় অনেক অগ্রগতি সাধিত হয়। সুতরাং যখন তিনি কোন বিষয়ের উপর অবস্থান করেন তা স্পষ্টভাবে প্রারম্ভ, মধ্য ও এর পরিণতির দিকে লক্ষ্য রাখবেন যখন নৃতন কোন বিষয় উপস্থিত হয় তখন অতীতের পুরাতন বিষয় তিনি পরিত্যাগ করেছেন এবং এর অদৃশ্য সম্পর্কে আর সচেতন ছিলেন না। কিন্ত এখন ইহা ভিন্ন রকমের। পুরাতন বিষয়ের অদৃশ্যেই তিনি নুতন বিষয়ের জন্য পুরাতন বিষয় সম্পর্কে সচেতন ভাব ত্যাগ করেন।
🌻(ক) যখন একাগ্রতা উন্নত হয় তখন বিষয়ের আকস্মিক উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি সম্পর্কে তিনি সম্যক ধারণা লাভে স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন যে গত-আগত সমস্ত বিষয়ই অস্থায়ী।
🌷(খ) এই আলোকে তিনি আরও নবতর ধারণা লাভ করেন যে অনিত্যতা সুখের উৎস নয় বরং ইহা দুর্ভাগ্যের কারণ ঘটায় অথবা তিনি এ প্রকারের ধারণা লাভ করবেন যে প্রাণীগণ জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট কারণ তারা এর অস্থায়ী প্রকৃতি সম্পর্কে অজ্ঞ। অথবা জীবন অত্যন্ত ভয়ঙ্কর এবং জীবগণ অনিত্যতার ফল, যেকোন মুহূর্তে জীবগণ মরতে পারে।
💐(গ) এ দুই প্রকারের ধারণা লাভসহ আরও একটি নৃতন ধারণা হবে যেহেতু প্রকৃতির নিয়ম অনিত্যতা বর্তমান, তাই কেহ এই অনিত্যতাকে নিত্যে পরিণত করতে পারেনা।
প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধারণা যথাক্রমে মন ও বিষয়ের অনিত্য, দুঃখ ও অনাত্মা ভাবেরই ইঙ্গিত প্রদান করে।
জানা বিষয় থেকে সহসা অজানা বিষয়ে গমন করেন এবং বুঝতে পারেন যে কোন ব্যতিক্রম ছাড়াই মন ও বিষয়ে অনিত্য, দুঃখ ও অনাত্মার স্বভাব সহজাত।
যখন এ ধারণা লাভ করেছেন তখন তিনি একবার বা দুবারের বেশি এদেরকে মনে আসতে দেবেন না। তারপর তিনি পূর্বের সেই চারি উপাদান উঠা, নামা, বসা ও স্পর্শ করার দিকে একাগ্রতা স্থাপন করবেন।
🌸চতুর্থ বিদর্শন (উদয় ব্যয় জ্ঞান)ঃ যখন তিনি সেই চারি উপাদানের উপর একাগ্রচিত্ত হন তার সচেতনতার অগ্রগতি সাধিত হয়। এই স্তরে যাওয়ার পূর্বে যখন তিনি শ্বাস গ্রহণ করতে থাকেন তখন তিনি নাভি দেশের উঠার গতি সম্পর্কে সচেতন হবেন। তার সচেতন ভাবের অগ্রগতির কারণে তিনি উঠা ভাবের অনেকগুলি স্তরের দিকে সচেতন থাকবেন। শ্বাস পরিত্যাগের সময় তিনি নাভিদেশের নামার দিকে সচেতন হবেন। তিনি নামার অনেকগুলি স্তরের দিকে সচেতন হবেন। অন্যান্য দৈহিক গতির যেমন ঝুকে পড়া, প্রসারণ, বসা, দীড়ান, শোওয়া ইত্যাদি সম্পর্কেও তিনি আরও সচেতন হবেন। তিনি সমস্ত শরীর ব্যাপী তড়িৎ স্পন্দনের উপস্থিতি অনুভব করে সচেতন হবেন যে সম্পর্কে ইতিপূর্বে তিনি সচেতন ছিলেন না। কেহ কেহ সমস্ত শরীরে ত্বরিত চুলকান বা যন্ত্রণা সম্পর্কে সচেতন হবেন। এ অবস্থায় সমাধি উত্তমরূপে অবস্থান করে। যখন কোন বিষয়ের আগমন হয় তখন সচেতন ভাব এর দিকে সোজা ধাবিত হয়। কখনো কখনো ইহা এ রকমভাবে উপস্থিত হয় যেন বিষয় বরাবরে সচেতন ভাবের উপর পতিত হচ্ছে। সচেতন ভাব স্পষ্ট। তিনি এক বিষয়ের থেকে অন্য বিষয় স্পষ্টরূপে চিনতে পারেন। সমাধি বলবৎ হওয়ার ফলে যদি তিনি উপস্থিত বিষয়গুলির অনুসরণ করেন, যদিও এগুলি অবিশ্বাস্যভাবে ত্বরিৎ গতিতে আসে ও যায় সাধক/সাধিকা সে সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন। সমাধির এই অগ্রগতির ফলে সহসা অনুভব করবেন যেন তার পারিপার্শিক অবস্থা আলোকিত হচ্ছে যেদিকেই তিনি তাকান তিনি যেন কিছু আলো দেখতে পান।
তার সুস্থির সতর্কভাবের ফলে তিনি প্রীতি লাভ করতে পারেন, সমাধি বলবৎ হলেই এ ধরনের আনন্দ লাভ করতে পারেন। এ আনন্দ বোধের কারণে শরীরের বিভিন্ন অংশের মধ্য দিয়ে এক ধরনের সুখময় কম্পন অতিক্রান্ত হয়, এ আনন্দবোধের কারণে চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে পারে, অনুভব করতে পারেন তিনি যেন নাগরদোলায় চড়ছেন। এখানে সতর্কবাণী দিতে হবে, তিনি চারিদিকে অদ্ভুত অথচ আনন্দময় যা দেখেন, আনন্দাভূতি, বিস্ময়কর সুস্থির সচেতনভাবের ফলে তিনি যে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন, তা তাকে বিদর্শন ভাবনা থেকে অসৎ উদ্দেশ্যে বা বিপথে পরিচালিত করতে পারে, ভাবনা কেন্দ্রে অনেকেই আনন্দবোধ, বিস্ময় অভিজ্ঞতায় প্রীতি লাভ প্রভৃতি যখন সমাধির সাথে অদৃশ্য হয় তখন তীব্রভাবে কাদতে শুরু করেন।
সুতরাং যখন আলো দেখেন, আনন্দ অনুভব করেন, বিস্ময়কর অভিজ্ঞতায় আকৃষ্ট হন তখন এগুলিকে কুমন্ত্রণাকারী ভেবে সচেতন থাকতে হবে। তিনি এগুলির দিকে নিজেকে আর মোহগ্রস্থ হতে দেবেন না। সচরাচর এ কুমন্ত্রণাকারী বিষয়গুলির অদৃশ্য না হওয়া পর্যন্ত তাকে ‘দেখছি’, “দেখছি’ “আনন্দ বোধ করছি’ ‘বিস্ময়কর মনে হচ্ছে’ ইত্যাদি বা অন্য কোন শব্দে তাদের ডাকতে হবে। প্রারম্ভে এগুলির প্রতিদ্বন্দ্বী হতে কঠিন মনে করবেন যেহেতু, সেগুলি তার কাছে অত্যন্ত প্রিয়। কিন্তু অধ্যবসায় ও জ্ঞানের সাথে এগুলিকে জয় করতে হবে।
পঞ্চম বিদর্শন(ভঙ্গ জ্ঞান)ঃ সমাধি যখন বলবৎ হয় বিষয়ের কেবল প্রথমদিকে উত্তরমরূপে না দেখে শেষের দিকে দেখেন। যখন ভাব এরকম হয় তিনি মনে করেন, পূর্বের চাইতে বিষয়গুলি তার নিকট দ্রুত অপসারিত হচ্ছে তার উন্নততর সমাধি লাভের জন্যই তার এরকম অবস্থা হয়। ব্যাখ্যা নিম্নে দেওয়া হল।
পূর্বে তিনি যখন নাভিদেশের উত্থান সম্পর্কে একাগ্রতা স্থাপন করেছিলেন তিনি কেবল তার উঠাভাব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন কিন্তু যখন নাভিদেশের উঠা ভাবের উপর একাগ্রতা স্থাপন করছেন তিনি কেবল উঠা ভাবের অস্ত ধানের উপর সচেতন হচ্ছেন না মনের অন্তর্ধানের উপরও সচেতন হন। তিনি স্পষ্টভাবে উঠা ভাব ও মনের সচেতন ভাবের অন্তর্ধান সম্পর্কে উপলব্ধি করেন এবং মন সচেতন ভাবকে ত্বরিত গতিতে অনুসরণ করে, অন্যান্য বিষয় যেমন নামাভাব, বসা, দাড়ান, ঝুকে পড়া, প্রসারণ, যন্ত্রণা চুলকান প্রভৃতি বিষয়ের বেলায়ও একই অবস্থা হয় এবং সচেতন মন ও বিষয়ের অন্তর্ধান সম্পর্কে তিনি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন।
কখনো কখনো এই স্তরে অপ্রতিভ ঘটনা ঘটে থাকে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায় হাত নোয়ানোর ইচ্ছা হওয়া মাত্রই তার ইচ্ছা সম্পর্কে সচেতন হন, সেহেতু মানসিক উদ্দীপনা সচেতন ভাবের দ্বারা ভেঙ্গে যায়, মুহূর্তের জন্য নিজের হাত নোয়াতে অসমর্থ হন। এটা ভাল লক্ষণ। ইহা সমাধির অগ্রগতি হচ্ছে বলে প্রতিপন্ন হয়। যখন এ অবস্থায় পৌছেন তখন তাকে পূর্বের সেই চারি উপাদান সম্পর্কে ধারণা পরিত্যাগ করতে হবে। তার চেতনায় যে বিষয়ই উপস্থিত হোক তাতেই তিনি মনোনিবেশ করবেন। কেবল মাত্র যখন তিনি ক্লান্ত হন অথবা কতগুলি শক্তিশালী চিত্ত বিক্ষেপ ভাব তার সচেতন ভাবকে ভঙ্গ করবে তখন তার সেই চারি উপাদানের দিকে ফিরে আসা উচিত এবং তিনি সুস্থির সচেতন ভাব ফিরে পাওয়া মাত্রই তার চেতনায় সে চার উপাদানের ভাব উপস্থিত হলে ব্যাপকভাবে সেগুলির প্রত্যেকটিতে একাগ্রতা স্থাপন করা উচিত।
✏️ষষ্ঠ পরিজ্ঞান(ভয় জ্ঞান)ঃনিয়মিত দর্শন, তরি ফল লাভ, বিষয়ের অদৃশ্যতা, এরকম অদৃশ্য সম্পর্কে সচেতন মন প্রভৃতির পর তিনি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন যে পূর্বে বিষয় ও মন অস্থায়ী ছিল বলে বর্তমানে অস্থায়ী এবং ভবিষ্যতেও অস্থায়ী হবে এ ধারণার উপর সচেতন হবেন এবং ইহা অপসারিত না হওয়া পর্যস্ত বুঝতে পারছি’, “বুঝতে পারছি’ বলুন। অধিকন্ত বিষয়গুলির সচেতন ভাবের মধ্যে এক ধরনের ভয়ের অনুভূতি সম্পর্কে সচেতন হবেন। এটা কোন ভয়ঙ্কর জন্তু বা ভূতের সম্মুখীন হওয়ার ভয়নাভূতি নয়, গভীর প্রজ্ঞা থেকে জাতি বস্ত ও মনের নশ্বরতা সম্পর্কে এ ভয়ের অনুভূতি আসে। এ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং ইহা উপস্থিত হলেই “ভীতিজনক’ “ভীতিজনক’ বলতে হবে।
🥀সপ্তম বিদর্শন(আদীনব জ্ঞান)ঃপূর্ববর্তী স্তর, বর্তমান স্তর ও এর পরবর্তী স্তর একই প্রকৃতির। এক স্তর অন্য স্তর থেকে তুলনামূলকভাবে তারতম্য বর্তমান। যখন এই স্তরে পৌছেন তখন তিনি বস্তু মনের নশ্বরতা সম্পর্কে পূর্ববর্তী স্তরের চাইতে আরও বেশি স্পষ্টতর ধারণা লাভ করেন। সুতরাং বস্তু ও মনের প্রতি তার ঘৃণাভাব জন্মে। মাঝে মাঝে তিনি নশ্বর মন ও বস্তু মন্দ, অকেজো ও ভয়ঙ্কর বলে দোষারোপ করেন, যেহেতু পুনর্জন্মের ফলেই বার্ধক্য, রোগ, মৃত্যু চিন্তা, চরম দুর্ভোগ, প্রিয় বিয়োগ ইত্যাদি হয়, যে মায়া বাস্তবতাকে দৃশ্য থেকে অবলোকন করে তাকেই দোষারোপ করতে পারেন। তিনি জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল প্রচেষ্টাকেই অস্থায়ী বলে দোষারোপ করতে পারেন, প্রত্যেক সময় তিনি যেভাবে দোষারোপ করেন সে সম্পর্কে সচেতন হয়ে বলবেন “দোষারোপ করছি, দোষারোপ করছি” এ স্তরে তিনি অনুভব করবেন তার সমস্ত শরীর যেন সত্ব বিভিন্ন অংশে বিভাজিত হচ্ছে। কোন কোন যোগী অনুভব করবেন যেন তাদের দেহ অতি সত্তর পচে গলে যাচ্ছে।
🍁অষ্টম পরিজ্ঞান(নির্বেদ জ্ঞান)ঃ প্রত্যেক বিষয়ের প্রতি সচেতন হওয়ার প্রয়োজন বোধ করে সেহেতু ইন্দ্রিয় চেতনায় প্রত্যেকটি বিষয় আবির্ভূত হয়। মন ও বিষয়ের প্রতি বিতৃষ্ণাভাব জন্মানোর ফলে যখন বিষয়ের এই স্তরে এসে পৌছেন বিদর্শনের জন্য তার উৎসাহে ভাটা পড়ে, বিতৃষ্ণাভাব পোষিত মন বিষয়ের সচেতনভাব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তার বিদর্শন পরিত্যাজ্য হয়েছে বলে অনুভূত হয়। যা হোক তিনি নিজে ইহা পরিত্যাগ করতে অসমর্থ হন। তার সমাধি বলবৎ হওয়ার কারণে বিদর্শন স্বয়ংক্রিয় হিসাবে উপস্থিত প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে তিনি সচেতন হন। এই স্তরে তিনি গল্লের একজন মানুষের মত হন। ধুলা, কাদা ও মল মুত্রাদি ঢাকা এক রাস্তা তাকে অতিক্রম করতে হয়। তিনি রাস্তায় পা ফেলতে অনিচ্ছুক হবেন। এ রকম রাস্তা দিয়ে চলার উপর বিরক্তি উৎপন্ন হওয়া সত্ত্বেও জরুরী কাজে যোগদানের জন্য তাকে রাস্তার অপর প্রান্ত দিয়ে যেতে হবে। যদিও মন ও বিষয়ের সচেতন ভাবকে ঘৃণা করেন তাকে বিদর্শন ভাবনা চালিয়ে যেতে হবে। রাস্তা থেকে বিদর্শনের মধ্যে পড়ে থাকা মন ও বিষয়ের সম্পূর্ণ বিনাশ সাধনের দিকে লক্ষ্য রেখে বিদর্শনের পূর্বে বা ইহার প্রাথমিক অবস্থায় যখন ধনী, ক্ষমতাবান লোক, দেব ও ব্রহ্মার কথা ভাবেন তিনি তাদের দ্বারা অত্যন্ত আকৃষ্ট হন। যা হোক যখন তিনি বিদর্শনের স্তরে পৌছেন তখন এদের প্রতি বিতৃষ্ণা ভাব জন্মাবে যেহেতু তিনি সৌন্দর্য, আকর্ষণ, উজ্জ্বলতা, আকৃতি প্রভৃতি মায়াপূর্ণ বিষয়গুলি না দেখে তিনি কেবল বাস্তবতাকে দেখবেন।
🍀নবম বিদর্শন(মুমুক্ষা জ্ঞান)ঃ মন ও বিষয়ের প্রতি প্রবল বিতৃষ্তাভাবের ফলে যখন এই স্তরে পৌছেন তিনি স্পষ্টভাবে অনুভব করেন যেন এক প্রবল তাড়না মন ও বিষয়ের উপর সচেতনভাব থেকে তাড়িত করছে। তিনি অনুভব করতে আরম্ভ করেন যে যদি কোন বিষয় না থাকে, দৈহিক চেতনা না থাকে এবং মন না থাকে তাহলে ইহা উৎকৃষ্ট হবে। কারণ এগুলিই দুঃখের কারণ। ইহা তার পক্ষে উৎকৃষ্ট হবে যদি তিনি এ দুঃখভোগ থেকে মুক্তি পেতে পারেন এবং যেসব জায়গায় এসব কারণসমূহ অনুপস্থিত থাকে সেখানেই তিনি পৌছতে পারেন। এ ধারণাগুলি বিস্মৃত হওয়া উচিত নয়। কিন্ত তা একবার বা দুবারের বেশি পুন: মনে আসতে দেওয়া ঠিক হবে না। যদি এগুলি দুবারের বেশি পুনরায় মনে উদয় হয় তাহলে তা অপসারিত না হওয়া পর্যন্ত “পুনঃ মনে উদয় হচ্ছে’ “পুনঃ মনে উদয় হচ্ছে’ বলতে হবে।
🌺দশম বিদর্শন(প্রতিসংখ্যা জ্ঞান)ঃ কেহ কেহ মনে করেন যে তাদের বিদর্শন ভাবনার অভ্যাস বন্ধ রাখাই শ্রেয় হবে যেহেতু তারা একমাত্র অতি উদ্যমহীন ও অপ্রীতিকর বিষয়ের প্রতি সচেতন থাকে। যদি এরকম ভাবের উদয় হয় তা হলে তার এগুলি অদৃশ্য না হওয়া পর্যস্ত ভাবছি, ভাবছি বলতে হবে। কেহ কেহ এ সব চিন্তা থেকে রেহাই পাওয়া কঠিন বলে মনে করেন। তাই তারা ভাবনা কেন্দ্র থেকে পালিয়ে যান। কিন্তু বিস্ময়ে তারা দেখেন যে তারা বিদর্শন থেকে মুক্তি পেতে পারেন না। এমনকি বাড়িতেও তাদের যেকোন ইন্দ্রিয় চেতনায় পতিত প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে সচেতন হন। সুতরাং কিছুক্ষণ পরে তারা বিদর্শন ভাবনা চালিয়ে যাবার জন্য আবার ভাবনা কেন্দ্রে ফিরে আসেন। যখন এই স্তরে পৌছেন একজন অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক ইহা ভালভাবে জানেন। একজন অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক এটাও জানেন যেমন সে বিষয়ের প্রতি বিতৃষ্ণভাবের ফলে বিদর্শনের প্রতি উৎসাহ কমে যাচ্ছে। সুতরাং প্রশিক্ষক তাদের সাথে দৈনিক সাক্ষাতের সময় সর্বদা অনিত্য, দুঃখ ও অনাত্মাভাবের উপর সচেতন হওয়ার গুরুত্বের প্রতি জোর দেন। কারণ এই সচেতন ভাবের মধ্য দিয়েই মার্গ ও ফল লাভ করতে পারেন৷ এ উপদেশ অনুসারে কাজ করে তিনি কঠোরভাবে কাজ চালিয়ে যান। কেহ কেহ প্রশিক্ষকের থেকে কোন তৎপরতার প্রয়োজন মনে করেন না। তারা নিজেরাই এ সম্পর্কে ধারণা পেতে চান। ভাবনার এ স্তরে কোন কোন অসহ্য যন্ত্রণার অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেন। একাগ্রতা স্থাপন করুন এবং তা অদৃশ্য না হওয়া পর্যন্ত “বেদনা অনুভব করছি’ “বেদনা অনুভব করছি’ বলতে হবে।
🌸একাদশ বিদর্শন(সংস্কারোপেক্ষা জ্ঞান)ঃ বিদর্শন ভাবনায় ইহা অতি গুরুতৃপূর্ণ স্তর, মার্গ এবং ফল থেকে ইহা মাত্র দুটি স্তরের ব্যবধান। বস্তুত এ দুটি স্তর ধাপ নয়, এ স্তরের চরম শীর্ষে পৌছা মাত্রই স্বাভাবিক নিয়মে দুটি স্তর তাকে বরাবর মার্গ ও ফলের দিকে নিয়ে যায়। যা হোক যখন শেষ সীমার নিকটবর্তী হন তখন তিনি তার ভুল পদক্ষেপের জন্য বার বার আস্তে আস্তে এগিয়ে যেতে পারেন। বিদর্শন সম্পর্কে কিছু বলার পূর্বে চরম সীমার নিকটবর্তী হওয়ার সময়ে সে ভুল পদক্ষেপের দরুণ আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছেন তা উল্লেখ করা তার পক্ষে কল্যাণকর হবে। পূর্বের বিদর্শনসমূহ থেকে যখন বর্তমান বিদর্শনের স্তরে পদার্পণ করেন তখন তার মানসিক একাগ্রতা ও সমাধি উত্তম হয়। বিষয়ের প্রতি তার সচেতনতা উত্তম হয়। ইহা বলা অত্যুক্তি হবে না যে কোন বিষয় যত তুচ্ছই হোক না কেন তা যে কোন ইন্দ্রিয় চেতনার স্পর্শে আসা মাত্রই তার সচেতনতা তাকে এড়াতে পারবে না। এ উত্তম অবস্থা থেকে দৃঢ় সংকল্পের চরম শীর্ষের দিকে এগিয়ে যাবেন। দৃষ্টান্ত স্বরূপ যদি আমরা বলি এ বিদর্শনের চূড়ান্ত পরিমাপ ভিত থেকে ১০০ ডিগ্রি, এতে ৯৫ ডিগ্রি পর্যন্ত আরোহণ করলে এক অদ্ভুত সুখময় অভিজ্ঞতা অনুভব করবেন। এ অবস্থায় তার উন্নত সচেতনতা আরও বেশি তরান্বিত হয়। এতে অসাধারণ একটা কিছু ঘটাতে যাচ্ছে বলে মনে করেন। ইহা তাকে মার্গ ও ফলের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে চিন্তা করে তিনি আনন্দ অনুভব করেন। যত দ্রুত সম্ভব মার্গ ও ফল লাভের উদ্দেশ্যে একাগ্রতার উপর আরও বেশি মনোযোগী হবার প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। চিন্তা, প্রত্যাশা, আনন্দ, বিশেষ প্রচেষ্টা এবং এরূপ অন্যান্য জিনিস সচেতন ভাবের পক্ষে শক্র বিশেষ। এই কারণে সচেতনভাব দুর্বল হয় এবং ফলে অনেক সময় ৯৫ ডিগ্রি থেকে নিচের ডিগ্রিতে চলে আসেন। যারা ফসকে যান তাদের অনেকেই বাড়তি জ্ঞানের অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন। বিদর্শনের এই স্তরে চরম দৃঢ় সচেতনভাব অত্যন্ত প্রয়োজন। এ সময় কোন অবস্থাতেই তার মধ্যে চিন্তা প্রত্যাশা আনন্দ ইত্যাদি বিষয় মনে উপস্থিত হতে দেবেন না এবং এরূপ জিনিস তার চিত্ত বিক্ষেপ ঘটাবে, শিথিল অথবা বিশেষ প্রচেষ্টা করবে না। তিনি সচরাচর তার ভাবনা চালিয়ে যাবেন। এখন এ গুরুত্বপূর্ণ বিদর্শন সম্পর্কে আলাপ করা যাক। যখন এই স্তরে পৌছেন তার সচেতন ভাব পরিষ্কার হয়। তিনি অনুভব করেন যেন প্রচেষ্টা ব্যতীত এমনকি অতি তুচ্ছ বিষয়েও সচেতন হন। কখনো কখনো ত্বরিৎ গতিতে বিষয়গুলির পুনরাগমন হয়। ত্বরিৎ আগমন সত্ত্বেও প্রতিটি বিষয় পায়ের আঙ্গুল থেকে মাথা পর্যস্ত বিভিন্ন ইন্দ্রিয় চেতনার সংস্পর্শে আসার সাথে সাথে তার সচেতনতা জরুরী অবস্থায় খাপ খাওয়াতে সক্ষম। মন ও বিষয়ের অনিত্য, দুঃখ, অনাত্মভাবের ধারণার দ্বারা প্রধানত: সচেতন ভাব অনুসৃত হয়। এমনকি এই পরিজ্ঞানের প্রাথমিক স্তরেও সমাধি অথবা মনের একাগ্রতা উত্তম হয়। সেই কারণে কোন প্রচেষ্টা ছাড়া তুচ্ছ বিষয়েও তিনি সচেতন হন। সমাধি যখন উন্নত হয় কিন্তু অতি উৎকৃষ্ট নয় এমন স্তরে পূর্বের সেই চারি উপাদানের উপর বিষয়ের উপর যদি একাগ্রতা স্থাপন করতে পারেন ইহা তার সহায়ক হবে। পরবর্তী সময়ে সমাধি যদি উৎকৃষ্ট না হয় তবে এরূপ করতে সমর্থ হবেন না। উৎকৃষ্ট সমাধি লাভের সময় মন এক বিশেষ বিষয়ের উপর অনেকক্ষণ অবস্থান করার প্রবণতা দেখা দেয়, সুতরাং ইহা যখন সহজভাবে বিচরণ করে সম্পূর্ণ সুযোগ লাভ করা উচিত এবং ইন্দ্রিয় চেতনায় পতিত সকল বিষয়ের উপর একাগ্রতা স্থাপন করা উচিত। মার্গ ও ফলের দিকে প্রবল গতিতে নিজেকে তাড়িত করার পক্ষে সহায়ক হবে। সমাধি যখন শক্তিশালী হয় তখন কখনো কখনো অনুভব করেন যেন তিনি বাতাসে উত্তোলিত হচ্ছেন। কখনো কখনো তিনি অনুভব করেন যেন সুকোমল তুলা বা মখমলের টুকরাগুলির সাথে সমস্ত দেহ মৃদুভাবে স্পর্শ করছে। কখনো কখনো কদাচিৎ বিষয়গুলি উপস্থিত হয় এবং তিনি শান্তভাবে প্রত্যেকটি বিষয়ের উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হন। কখনো কখনো শরীরসহ সব বিষয় সচেতন ভাব থেকে একত্রে অদৃশ্য হয়। তার মানসিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন হন যেখানে এক চিত্তের পর অপর চিত্তের উৎপত্তি বিলয় সংঘটিত হয়।
যখন এই স্তরে পৌছেন তিনি সম্পূর্ণ মার্গ ও ফলের নিকটবর্তী হন। সুতরাং নিরাশ না হয়ে পরিশ্রম ও বিশ্বাসের সাথে তার ভাবনা চালিয়ে যাওয়া উচিত। যখন তার সচেতনভাব তৃরান্থিত হয় তাকে সতর্ক হতে হবে কারণ সচেতনতার পথে নিজেকে কঠোরভাবে নিয়োজিত রাখা ইহা অত্যন্ত প্রয়োজন। মার্গ ও ফলের পথে যাওয়ার এটি একটি চিহ্ন বিশেষ। সুতরাং কোন অবস্থাতেই সমাধির বিনাশ সাধনকারী প্রত্যাশা, আনন্দ চিন্তা প্রভৃতি দ্বারা চিত্ত বিক্ষেপ ঘটতে দেওয়া উচিত নয়, বস্ততপক্ষে এরা সমাধির পরম শত্রু। |
🌼দ্বাদশ বিদর্শন(অনুলোম জ্ঞান)ঃ পূর্ববর্তী বিদর্শন শিখরে পৌছামাত্রই এ দ্বাদশ বিদর্শন পরবর্তী নির্বাণে অবস্থান করার উপযুক্ততায় রূপান্তরিত করে। ইহা এক চিত্ত নিয়েই গঠিত, ইহা অনুলোম নামেই পরিচিত। ইহাই সর্বশেষ বিদর্শন জ্ঞান।
ত্রয়োদশ বিদর্শন(গোত্রভূ জ্ঞান)ঃ এ বিদর্শন গোত্রভূ নামে পরিচিত। এই বিদর্শন পূর্ববর্তী অনুলোম বিদর্শনের মত এক চিত্ত নিয়ে গঠিত, ইহা অবিলম্বে অনুলোমকে অনুসরণ করে। প্রথমবারের মতো সংসারের মধ্যে যে ছয়টি বিষয়ের উপর মন অবস্থান করতো গোত্রভূ চিত্ত সেগুলিকে পরিত্যাগ করে সম্পূর্ণ অন্য এক ভিন্ন বিষয়ের উপর অবস্থান করে যাহা চিত্তও নয় বিষয়ও নয়। বুদ্ধ ইহাকে নির্বাণ বলেছেন যার অর্থ দুঃখ, মন ও বিষয় ও পুনর্জন্ম নিরোধ।
অনুলোম ও গোত্রভূ বিদর্শনের স্থিতিকাল অত্যন্ত স্বল্প কারণ প্রতিটি পরিজ্ঞান এক চিত্ত নিয়ে গঠিত এ দুই জ্ঞানের অভিজ্ঞতা লাভের কোন সুযোগ নেই। এই বিদর্শন, বিদর্শন জ্ঞান নয়। যখন সাধক/সাধিকা বিদর্শন জ্ঞান লাভ করেন তার চেতনা মন ও বিষয়ের উপর অবস্থান করে।
গোত্রভূ নির্বাণের উপর অবস্থান করে। ইহাই বিদর্শন জ্ঞান ও গোত্রভূ, মার্গ এবং ফল বিদর্শনের মধ্যে পার্থক্য।
চতুর্দশ ও পঞ্চদশ বিদর্শন(মার্গ ও ফল জ্ঞান)ঃ যে চিত্ত গোত্রভভূকে অবিলম্বে অনুসরণ করে তাকে মগ্গ বলে। ইহাও নির্বাণের উপর অবস্থান করে।
প্রথম মার্গ দৃষ্টি অনুশয় ও বিচিকিৎসা অনুশয় নামক এই দুই অনুশয়ের মূল উৎপাদন করে। প্রথমটি মিথ্যা দৃষ্টি উৎপন্ন করে দ্বিতীয়টি বুদ্ধ ধর্ম ও সংঘের প্রতি দোদুল্যমান ভাবের উৎপাদন করে। দ্বিতীয় মার্গ পরবর্তী পঞ্চ অনুশয়কে দুর্বল করে। তৃতীয় মার্গ পঞ্চ অনুশয়ের মধ্যে কামরাগ অনুশয় ও প্রতিঘা অনুশয়ের মূল উৎপাটন করে। প্রথমটি রূপ, রস, শব্দ, গন্ধ, স্পর্শ এই পঞ্চকাম গুণের প্রতি আসক্তিও সৃষ্টি করে দ্বিতীয়টি ক্রোধের বীজ বপন করে।
চতুর্থ ও পঞ্চ মার্গ বান অনুশয়, ভবরাগ অনুশয়, অবিদ্যা পরবতী এই তিন অনুশয়ের মূল উৎপাটন করে। এখানে প্রথমটি অহংকারের বীজ রোপণ করে, দ্বিতীয়টি উত্তম কোন জিনিসের প্রতি আসক্তির বীজ বপন করে, তৃতীয়টি সত্য সম্পর্কে অজ্ঞতার বীজ বপন করে।
ফল মানে মার্গেরই ফল। যাদের পারমীর সংযোগ আছে তাদের দুটি ফল চিত্তের উত্তব হয় এবং তা মার্গকে অনুসরণ করে। যাদের পারমী আরো শক্তিশালী হয় তাদের তিনটি ফলচিত্ত উৎপন্ন হয় এবং তা মার্গকে অনুসরণ করে। ফল চিত্তও নির্বাণের উপর অবস্থান করে।
প্রত্যবেক্ষণ জ্ঞানঃ আরো একটি বিদর্শন আছে। ইহাকে প্রত্যবেক্ষণ জ্ঞান বলা হয়, এই বিদর্শন একজনের (১) মার্গ (২) ফল (৩) নির্বাণের অভিজ্ঞতার কথা পুনরায় মনে করিয়ে দেয়, যা হোক কোন কোন অসাধারণ ব্যক্তি (8)মনের যে অপবিভ্রতার মূলোৎপাটিত করেছেন (৫) মনের যে অপবিত্রতা রয়ে গেছে তা পুন: পুন: স্মরণ করতে পারেন।
এই বিদর্শন বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। এই বিদর্শনের ফলে সাধক/সাধিকাগণ তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা গুরুকে নিম্নলিখিত অনুসারে বর্ণনা করতে সমর্থ হন।
(ক) কেহ কেহ বলেন, “বিষয় এবং সচেতনভাব হঠাৎ অদৃশ্য হল যেন তাদেরকে কেটে দেয়া হল।’
(খ) কেহ কেহ বলেন, “বৃক্ষ থেকে একটি ছোট শাখা ঠিক কেটে ফেলার মত বিষয় ও সচেতনভাবকে হঠাৎ কেটে ফেলা হল।”
(গ) কেহ কেহ বলেন, “ঠিক একটি ভারি বোঝা মাথা থেকে নামিয়ে ফেলার মত আমরা হঠাৎ বিষয় ও সচেতনভাবের বোঝা থেকে মুক্ত হওয়ার অনুভব করলাম।’
(ঘ) কেহ কেহ বলেন, “কোন জিনিস হাত থেকে ঠিক পতিত হওয়ার মত বিষয় ও সচেতনভাব হঠাৎ পতিত হয়েছে অনুভব করলাম।’
(ড) কেহ কেহ বলেন, “কারাবাস থেকে মুক্তি পাওয়ার মত হঠাৎ আমরা যেন বিষয় ও সচেতনতা থেকে মুক্ত হলাম।
(চ) কেহ কেহ বলেন, “ঠিক ক্ষীণ অগ্নিশিখা নির্বাপিত হওয়ার মত বিষয় ও সচেতনভাব যেন হঠাৎ নির্বাপিত হল।’
(ছ) কেহ কেহ বলেন, “অন্ধকার থেকে আলোর দিকে তাড়িত হওয়ার মতো যেন আমরা বিষয় ও সচেতনভাব থেকে তাড়িত হলাম।’
(জ) কেহ কেহ বলেন, “আবর্জনার স্তুপ থেকে নির্মল জায়গায় লাফ দেয়ার মতো যেন জামরা বিষয় ও সচেতনভাব থেকে লাফ দিলাম।”
(ঝ) কেহ কেহ বলেন, ‘একটি ভারী পাথর জলের মধ্যে ডুবে যাওয়ার মত
(ঞ) কেহ কেহ বলেন, পিছন থেকে সম্মুখে তাড়িত কোন ছুটন্ত ব্যক্তি তার দৌড় হঠাৎ বন্ধ করার মত বিষয় ও সচেতনভাব যেন হঠাৎ বন্ধ হল।বিষয় ও সচেতনভাবের সামগ্রিক অন্ত ধানের স্থিতিকাল দীর্ঘ নয়, ইহা মার্গ চিত্ত এবং দুইটি ফল চিত্ত এই তিন পরম্পরা চিত্তের স্থিতিকালের মত দীর্ঘ। যা হোক যেহেতু ইহার উপস্থিতি অসাধারণ ইহা সাধক/সাধিকাদের উপর প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করে। তাদের অভিজ্ঞতার কথা পুন:স্মরণ করে কেহ কেহ বলেন, “ইহা একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা”, কেহ কেহ অনুমান করেন যে ইহা নিশ্চয়ই মার্গ ও ফল হবে। বৌদ্ধধর্মে জ্ঞান সম্পন্ন কোন কোন লোক জানেন যে, বিষয়সমূহের সামগ্রিক নিবৃত্তিই নির্বাণ। তারা আরও জানেন যে, তাদের মার্গ ও ফল প্রাপ্তির কারণ বিষয়সমূহের সামগ্রিক নিবৃত্তি সম্পর্কে তারা সচেতন ছিলেন।
মুখ্য পরিজ্ঞানসমূহে সাধক/সাধিকার অভিজ্ঞতার পুনরায় স্মরণ করার ঠিক পর পরই তার মন চতুর্থ পরিজ্ঞানে ফিরে যায়, নির্বাণের এই অদ্ভুত অভিজ্ঞতা এত সুখকরভাবে উত্তেজিত করে যে তিনি কিছুক্ষণের জন্য বিদর্শন ভাবনা চালিয়ে যেতে পারেন না।
সাধক/সাধিকাকে পরীক্ষা করা হয়
সাধক/সাধিকা যখন পরবর্তী সাক্ষাৎকারে গুরুর সাথে দেখা করেন তিনি তার অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেন। যা হোক মার্গ ও ফলের উপর কিছু ভুল হতে পারে বলে গুরু তাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন। সাধক/সাধিকা যদি এ প্রশ্রগুলি সন্তোষজনক উত্তর দিতে না পারেন তাকে আরও একটু কঠোরভাবে অনুশীলন করার অনুরোধ জানিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয় যেহেতু তিনি গন্তব্যস্থলের নিকটবর্তী হয়েছেন। যদি মার্গ ও ফল লাভ করার পক্ষে সন্তোষজনক বলে মনে করা হয় তাকে উপযুক্ত পরীক্ষার জন্য রাখা হয়। পরিচালক ভিক্ষু ও গুরুই শুধু এ পরীক্ষা সম্পর্কে জানবেন।
পুন: পুন: ফল লাভ করতে সাধক/সাধিকাকে বলা হচ্ছে পরীক্ষাগুলির মধ্যে একটি। ফল লাভ করার উদ্দেশ্যে সাধক/সাধিকা নৃতন করে ধ্যানমগ্ন হবার প্রয়োজন বোধ করেন না। প্রথম পদক্ষেপে যেটি তার প্রয়োজন হবে সেটা হচ্ছে ইচ্ছা পোষণ করা। দৃষ্টান্তের সাহায্যে বলা যায় পাচ মিনিট ধরে ফল লাভ করতে সাধক/সাধিকা ইচ্ছা করেন। সে বিষয়ে তিনি এরূপ ইচ্ছা করেন “আমার অর্জিত ফল আমাকে লাভ করতে দেয়া হোক। ইহা পাচ মিনিট স্থায়ী হোক’ এরপর সাধক/সাধিকা বিদর্শন ভাবনা অভ্যাস করেন, যেভাবে তিনি পূর্বে করেছেন। তাড়াতাড়ি পুন:ফল লাভ করবেন। তার ইচ্ছা অনুসারে ইহা পাচ মিনিট স্থায়ী হয়, মানসিক একাগ্রতার ভিত্তিতে সাধক/সাধিকাদের তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়: দুর্বল, মাঝারি, প্রবল উৎসাহী। দুর্বল চিত্ত সাধক/সাধিকাদের ফল কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়, মধ্যম শ্রেণীর সাধক/সাধিকাদের কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়। উৎসাহী সাধক/সাধিকাদের কয়েকদিন ফল স্থায়ী হয়।
ফল লাভ করার অবস্থাকে ফল সম্পত্তি বলা হয়। যখন ফল সম্পত্তি লাভ হয় তখন সাধক/সাধিকাদের কী অবস্থা হয়? যখন সাধক/সাধিকা ফল সম্পত্তি লাভ করেন তখন তার চিত্ত সমস্ত বিষয় পরিত্যাগ করে নির্বাণের উপর অবস্থান করে। তিনি রূপ, রস, শব্দ, গন্ধ, স্পর্শ ও চিন্তিত বিষয়ের উপর আর সচেতন হন না। যখন তিনি ফল সম্পত্তিতে প্রবেশ করেন, বসার সময় তিনি মূর্তির মত স্থির হয়ে বসেন, দাড়ানোর সময় মূর্তির মত স্থির হয়ে দাড়ান। ফল সম্পত্তি শেষ হওয়া মাত্রই ছয় বিষয়ের যেকোন একটির প্রতি সচেতন হন।
ফল পুন: লাভ করতে যখন অভ্যাস করেন তিনি মার্গ আর ফল লাভ করার অভ্যাস করতে যেভাবে তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সেভাবেই সব নিয়মগুলি কঠোরভাবে তাকে মেনে চলতে হবে। যখন ফলের নিকটবর্তী হয়েছেন তখন কোন কিছুর আশা পোষণ বা উত্তেজনা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকাই সব চাইতে গুরুতৃপূর্ণ নিয়ম। যদি এগুলি সাধক/সাধিকার মধ্যে থাকে তবে এ সম্পর্কে সচেতন হয়ে অতি সত্বর এগুলিকে তাড়িয়ে দিতে হবে। “পাওয়ার ইচ্ছা করছি’ অথবা “উত্তেজনা বোধ করছি’ বা অন্য কোন যথাযথ শব্দে তার সচেতনতার দৃঢ়তা আনয়নের জন্য বলতে হবে। যখন মার্গ ও ফল লাভ করেন সত্যানুসন্ধান করে বের করার পক্ষে এটাই উন্নত পরীক্ষা।
আরেকটি উন্নত পরীক্ষাঃ এমনকি পরীক্ষা সফল হয়েছে গুরু এরূপ জানার পর তিনি তা ঘোষণা করবেন না যে সাধক/সাধিকা মার্গ লাভ করেছে তার পক্ষে এরূপ করা নিষিদ্ধ। সাধারণ আর্যপুত্র হয়ে তিনি ভুল করতে পারেন। তাই গুরু সাধক/ সাধিকাকে একটি পাক্ষিক সভায় পাঠান। সেখানে পরিচালনাকারী ভিক্ষু ধর্মোপদেশ দেন। ধর্মোপদেশকালে পরিচালনাকারী ভিক্ষু সকল পরিজ্ঞানের মুখ্য বিষয়সমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন। তিনি এই পরিজ্ঞানগুলির নাম উল্লেখ করেন। তিনি নিজের অভিজ্ঞতা ও ব্যতিক্রমধর্মী কোন কোন সাধক/সাধিকার অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেন। তিনি বুদ্ধের শিক্ষা থেকে প্রাসঙ্গিক ধারাসমূহ বার বার উল্লেখ করেন। অভিজ্ঞতার অনুকূলে বৌদ্ধধর্মের উপর লিখিত ভাষ্য ও উপভাষ্য থেকেও তিনি উল্লেখ করেন। মার্গ ও ফল লাভ করে যখন অসাধারণ অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন তখন তিনি সময়ের কিছু ব্যবধানে বাস করেন। ধর্মোপদেশ শুনতে শুনতে তিনি ধর্মোপদেশে বর্ণিত অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার তুলনা করেন এবং বিদর্শনের মধ্য দিয়ে প্রকৃতভাবে তিনি মার্গ ও ফলে যেতে পেরেছেন, কিনা নিজে স্থির করেন। শিক্ষা কর্তৃপক্ষ যেভাবে ফল ঘোষণা করেন ভাবনা কেন্দ্রে ঠিক সেভাবে গুরু বা কেহই সাধক/সাধিকাদের মধ্যে কে মার্গ ও ফল পেয়েছেন, কে পান নাই একথা ঘোষণা করবেন না। এটা তাদের কাজ নয়। একমাত্র বুদ্ধই এই ঘোষণা করতে পারতেন। সুতরাং কেবলমাত্র গুরু ও পরিচালনাকারী ভিক্ষু সাধক/সাধিকাদের অভিজ্ঞতার সাথে তুলনা করার জন্য বিস্তৃতভাবে পরিজ্ঞান বর্ণনা দিতে পারেন। সে অনুপাতে তুলনা করে সাধক/সাধিকাগণ মার্গ ও ফলসহ অন্যান্য পরিজ্ঞানের মধ্যে প্রকৃতভাবে যেতে পেরেছেন কিনা তা নিজেরাই স্থির করেন।
অন্যান্য মার্গগুলি সংক্ষেপে বলতে গেলে অবশিষ্ট মার্গ ও ফলসমূহ বিদর্শন ভাবনার মাধ্যমে অনুরূপভাবে লাভ করা যায়।

সম্মন্ধে SNEHASHIS Priya Barua

এটা ও দেখতে পারেন

মেডিটেশান এবং আপনার ব্রেইন

Leave a Reply

Translate »