ব্রেকিং নিউজ

প্রবারণা পূর্ণিমাঃ স্নেহাশীষ প্রিয় বড়ুয়া

bapy2

বৌদ্ধমতে ঋতু ৩টি- গ্রীষ্ম, বর্ষা এবং হেমন্ত । চৈত্র, বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাস = গ্রীষ্ম ঋতু; শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন ও কার্তিক মাস = বর্ষা ঋতু এবং অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ ও ফাল্গুন মাসকে = হেমন্ত ঋতু । এ ঋতুগুলোর মধ্যে বর্ষায় অধিক বৃষ্টিপাত হয় । সে সময়কালে তাই ভিক্ষুনি/ভিক্ষুদের চলাচল খুবই অসুবিধা হতো । পরিধানের চীবর কিংবা কাপড়-চোপড় ভিজে যায়, নোংরা হয়, চলাফেরায় কাপড় উত্তোলন করা অশোভনীয় ও বিনয় পরিপন্থী । ভিক্ষুদের প্রাত্যহিক জীবনে; শয়নে, উপবেশনে এবং তাদের গমনাগমন ও চলাফেরায় অনেক বিনয়কর্ম পালন করতে হয় বলে বর্ষা ঋতুতে ভিক্ষুদের চলাচল ও ভ্রমণের ওপর বুদ্ধ বিধিবদ্ধ নিয়ম আরোপ করেছিলেন- যাকে বলা হয় বর্ষাব্রত বা বর্ষাবাস। এছাড়া বর্ষাবাসের মাধ্যমে বৌদ্ধ ভিক্ষুনি/ভিক্ষুদের জ্যেষ্ঠতা নির্ণয় করা হয়। জন্মগত বয়স দিয়ে ভিক্ষুনি/ভিক্ষুদের বয়স নির্ধারণ করা হয় না। বিনয় মতে যে ভিক্ষুনি/ভিক্ষু বর্ষাবাস যাপন করেন, তিনিই কঠিন চীবর লাভ করতে পারেন ।

‘প্র’ উপসর্গের সহিত বরণ বা বারন শব্দ যোগে প্রবারণা শব্দ নিষ্পন্ন হয় যাহা সংস্কৃত শব্দ । প্রবারণার পালি শব্দ ‘পবারণা’ । বড় জানতে ইচ্ছে করে মগধি ভাষায় (যে ভাষায় বুদ্ধ বানী নিসৃত) ইহাকে কি বলে ??? ‘প্রবারণা’ শব্দের অর্থ প্রকৃষ্টরূপে বরণ করা, নিষেধ করা ইত্যাদি । প্রবারণা পূর্ণিমার ডাক নাম আশ্বিনী পূর্ণিমা । প্রবারণাকে অনেকে বলেন বড় ছাদাং এর অর্থ বড় উপোস্থ দিবস । উপোসথ হলো গৃহীদের অষ্টশীল ব্রত পালন করা । প্রবারণা পূর্ণিমা মূলত, ভিক্ষুনি/ভিক্ষুদের অনুষ্ঠান । বৌদ্ধ ভিক্ষুনি/ভিক্ষুরা আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিণী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস ব্যাপী সময়ে বর্ষাব্রত পালন করেন । প্রতি অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় ভিক্ষু ও ভিক্ষুণী সীমায় একত্রিত হয়ে অসাবধানতাবশত যদি কোনো ক্ষুদ্রানুক্ষুদ্র দোষত্রুটি জীবন চলার পথে সংঘটিত হয়ে থাকে, তা তাঁরা পারস্পরিক ‘আপত্তি দেশনা’র মাধ্যমে পরিশুদ্ধ থাকার অঙ্গীকারে অঙ্গীকারবদ্ধ হবেন । তাঁরা ভিক্ষুসীমায় বসে প্রাতিমোক্ষ পাঠ বা দেশনা করবেন । প্রাতিমোক্ষে সন্নিবেশিত অবশ্য-প্রতিপালনীয় শীলগুলোর মাহাত্ম্য পর্যালোচনাপূর্বক তাঁর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও প্রয়োজনীয়তা বুঝে নেবেন । উল্লেখ্য ভিক্ষু এবং ভিক্ষুনি ভেদে পাতিমোক্‌খশীল গুলির মধ্যে ভিন্নতা থাকলে ও বুদ্ধ যে চারটি বিধান (পারাজিকা) সঙ্ঘকে কঠোরভাবে পলন করতে নির্দেশ দিয়েছেন বা যা করলে ব্রহ্মচর্য জীবন থেকে স্খলন বা পরাজয় ঘটে তা কিন্তু এক এবং তা হচ্ছে – ক) যৌনাচার, খ) অদত্ত দ্রব্য গ্রহণ, গ) নরহত্যা, ঘ) অর্হত্ব, যে কোনো মার্গফল বা ধ্যানবল প্রাপ্তির মিথ্যা দাবি । কারন এগুলো বিমুক্তি বা মোক্ষ লাভের পক্ষে মহাঅন্তরায়কর । যদি কোন ভিক্ষু এক বা একাধিক লঙ্ঘন করে থাকেন এবং সে বিষয়ে সঙ্ঘের নিকট যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ ইত্যাদি থাকে তবে সঙ্ঘ সেই অপরাধীকে সঙ্ঘ থেকে বহিস্কার করা অথবা অবস্থাভেদে গুরুত্বানুসারে অন্যান্য শাস্তিও প্রদান করতে পারেন। যাই হোক পবারণা হলো ভিক্ষুনি/ভিক্ষুদের আত্নসমর্পন ও আত্ননিবেদনের অনুষ্ঠান।

ইতিহাসে যে রকম উল্লেখ আছে তা অনেকটা এরকম – আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত এ তিন মাস গৌতম বুদ্ধ তাবতিংশ স্বর্গে মাতৃদেবীসহ দেবতাদের উদ্দেশে অভিধর্ম দেশনা করেন (তিন পিটকের মধ্যে অভিধর্ম হচ্ছে উৎকৃষ্ট যা তিনি মা ও দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করেছেন আর আজ আমরা সেই মাতৃজাতীকে কতটুকু সম্মান প্রদর্শন করছি আপনারা ভেবে দেখবেন কি ???)।

সে সময় কোশলা জনপদের এক আবাসে বর্ষাবাস পালন করাপ পর বুদ্ধকে দর্শন করা সংঘের রীতি ছিল । বুদ্ধকে দর্শন করার নিমিত্তে শ্রাবস্তী গমন করে জেতবনে উপস্থিত হয়ে বুদ্ধকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে একান্তে বসিলে বুদ্ধ তাহাদের বর্ষাবাস যাপন সম্পর্কে জানতে চাইলে তাঁরা বললেন, আমরা বিবাদ বিসংবাদ এড়ানোর জন্য পরস্পর পরস্পরের সহিত কথা না বলে মৌনব্রত অবলম্বন করেই বর্ষাবাস যাপন করেছি ।

বুদ্ধ তা শুনে বললেন, এক সঙ্গে বসবাস করতে গেলে বিবাদ-বিসংবাদ হওয়া স্বাভাবিক, তাই বলে মৌনব্রত অবলম্বন সমীচিন নয় । এ বিবাদ-বিসংবাদ এড়ানোর নিমিত্তে বর্ষাবাস সমাপনান্তে সবাই প্রবারণা করবে । প্রবারণা হচ্ছে পরপস্পর পরস্পরের প্রতি দোষ ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা । যার মাধ্যমে শাসনের পরিশুদ্ধি এবং ভিক্ষুদের উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধি সাধিত হয় এবং এ দিনেই সর্বজ্ঞ বুদ্ধ, যশও তাঁর বন্ধুসহ সংঘকে তার সাধনালদ্ধ মহাসত্যের অমোঘবাণী প্রচারের নির্দেশ দেন এইভাবে- বহুজনের হিতের জন্য, বহুজনের সুখের জন্য, জগতের প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শনের জন্য, দেব-মানুষের হিতের জন্য তোমরা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ো এবং ধর্মসুধা বিলিয়ে দাও । যার আদিতে কল্যাণ (শীল), যার মধ্যে কল্যাণ (সমাধি) এবং যার অন্তে কল্যাণ (প্রজ্ঞা), যা অর্থযুক্ত ও ব্যঞ্জনযুক্ত । বুদ্ধের এই বাণী চিরন্তন এবং চিরশ্বাশ্বত । এখানে বুদ্ধ সকল সম্প্রদায়ের সুখ ও মঙ্গলের কথা বলেছেন । সকলের কল্যাণের কথা বলেছেন । এই বাণীতেই বুদ্ধের মহত্ব, উদার মানসিকতা ও বিশাল হৃদয়ের মৈত্রী, মুদিতা, উপেক্ষা ও করুণার বহিঃপ্রকাশ । কোন ধর্মকে হেয় তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে কথা বলা ও তাই অকুশক কর্ম বলিয়াই বিবেচিত হয় ।

মহাকারুণিক বুদ্ধের নির্দেশে অনুপ্রাণিত সংঘ প্রবারণা পূর্ণিমার পরদিন থেকে একমাস পর্যন্ত কার্তিক পূর্ণিমার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন বৌদ্ধমন্দিরে দানোত্তম কঠিন চীবর দানোৎসব করে থাকেন বুদ্ধের অমিয় ধর্মবাণী বিশ্বমানবতার কল্যাণে ছড়িয়ে দিতে, যে বাণীতে অহিংসার বীজমন্ত্র, সাম্য ও মহামৈত্রীর আহবান, জাগতিক দুঃখ থেকে মুক্তির পথনকশা পক্ষান্তরে উপাসক উপাসিকারা পান কঠিন চীবর দান করার মহতী ক্ষন ।

প্রবারণা পূর্ণিমার অন্য একটি উৎসবময় দিক হলো ফানুস উত্তোলন। বুদ্ধ আধ্যাত্মিক শক্তিবলে দেবলোকে গিয়ে মাকে ধর্মদেশনা করে এদিন স্বর্গ থেকে মর্ত্যে অবতরণ করেন বলে বৌদ্ধগণ প্রবারণা পূর্ণিমায় আকাশে প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের প্রতীকরূপে ফানুস উত্তোলন করে । এ সংক্রান্ত আরেকটি কাহিনী হলো: সিদ্ধার্থ গৌতম কোনো এক সময় মাথার এক গুচ্ছ চুল কেটে বলেছিলেন তিনি যদি সিদ্ধিলাভের উপযুক্ত হন তাহলে এই কর্তিত চুল যেন নিম্নে পতিত না হয়ে ঊর্ধ্বে উঠে যায়। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী চুলগুচ্ছ আকাশে উঠে গিয়েছিল। তাই বুদ্ধের কেশধাতু পূজার স্মৃতিস্বরূপ আকাশে এই ফানুস ওড়ানো হয়।

এ কারণে আত্মবিশ্লেষণের শিক্ষা, মাতৃ কর্তব্য পালন ও বিনয়বিধান অনুশীলনের বহুবিধ মহিমায় এই প্রবারণা পূর্ণিমা মহিমান্বিত।

সম্মন্ধে vuato2

এটা ও দেখতে পারেন

মেডিটেশান এবং আপনার ব্রেইন

Leave a Reply